Search

Category

Bengali

খাজুরাহের ব্যর্থতা

“যুগটা পাল্টে গেছে। এখন আর কেউ পিওর ক্লাসিক্যাল নাচ দেখে না। কী হবে শিখে?” গীতাদি প্রশ্নটা ছুড়ে দিল নন্দিনীর দিকে।

নন্দিনীর অদ্ভুত লাগছে, সব কিছু যেন কিছুর জন্য করা। নিজের ভাল লাগার জন্য কিছু যেন করাটাই বৃথা। সবাই কোনো একটা উদ্দেশ্য নিয়ে কিছু করতে চায়। নিছক আনন্দের জন্য কিছু শেখাটা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। মাঝে মাঝে পাগল হয়ে যেতে বেশ লাগে। হোক না সে ক্ষণকালের স্ফূর্তি। তার মধ্যে যে অদৃশ্য তৃপ্তি লুকিয়ে আছে বোঝাবে কী করে?

“তবুও আমি শিখব”

“ভেবে দেখ। সেই পথটা কঠিন” গীতাদির অনীহাটা বেশ আঁচ করতে পারছে।

আশ্চর্য! 

গন্তব্য না থাকলে বুঝি পথ চলার কোনো মানেই হয় না। মানে দিশা ছাড়া কোনো কিছু করাটাই নিছক পাগলামো। কত স্বার্থ কেন্দ্রিক বৈষয়িক আমাদের চিন্তাধারা! উদ্দেশ্য ছাড়াও ভাল লাগাটা যে জীবনের চলার পথে মানসিক ব্যাপ্তির জন্য অনেক শ্রেয়। কে বোঝাবে গীতাদিকে?

“তবুও…”

“আবারও বলছি ভেবে দেখ”

কিছুটা বিরক্ত হয়েই হাল ছেড়ে দিল নন্দিনী। শুধু গোঁড়ামি নয়, এই দিকপালদের মধ্যে একটা ঔদ্ধত্য, অহং আছে। নন্দিনীর অত তোষামোদি করা পোষাবে না। নাই বা পারদর্শী হল, তা বলে কি শেখা যায় না? এরা, সব কিছুই কুক্ষিগত করে রাখতে চায় নিজেদের মধ্যে। এটাই এদের অস্তিত্বের অহং, কিংবা বেঁচে থাকার অবলম্বন। ভাববার কী আছে? মন চেয়েছে… শিখবে… ব্যস। অত হিসেব নিকেশের কী আছে?

ছোটবেলায় পাড়ার ফাংশনে বেশ কিছু রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যে প্রধান ভূমিকায় নেচেছিল। সে তো অনেকেই করে থাকে। সেটাকে নাচের পর্যায় ফেলতে চায় না নন্দিনী। নাচের তালিম পরে নিতে শুরু করেছিল ভারতনাট্যমের শিক্ষিকা করুণাদির কাছে। আল্লারিপু দিয়ে শুরু। তারপর কৌটুভম থেকে গণপতি বন্দনা। কলেজে ভর্তি হওয়ার পর পড়ায় ব্যস্ত হয়ে পড়লে, আর এগনো হয়নি। এতদিন পরে আবার মনে হল নাচের তালিম নিলে মন্দ হয় না। এবার সিরিয়সলি নাচটা শিখবে। মরুতাপ্পা পিল্লাই-এর সুযোগ্যা শিষ্যা গীতাদির কাছে তাই যাওয়া। 

বেশ। না হয় না-ই শেখাল। তাতে কী তার চর্চা বাধা পড়ে থাকবে? 

হুজুগের বশে দুম করে একদিন ইউনিভার্সিটি ক্লাসিক্যাল ডান্স কম্পিটিশনে নাম দিয়ে ফেলল। এক সময় কিছুটা ভারতনাট্যম শিখেছিল। সেটাকেই ঘষেমেজে কিছুটা ইম্প্রভাইসেশন করে নেমে পড়ল কম্পিটিশনের ঘোড়দৌড়ে। বাজিমাত করল প্রথম পুরস্কার জিতে। সেটা কোনো মেডেল বা আর্থিক সহায়তা নয়। খাজুরাহ ডান্স ফেস্টিভ্যলে নাচার সুযোগ। 

আনন্দে শৃঙ্গার যেন পাদমের ঝংকার তুলল মুদ্রার ছন্দে। ওইটাই নাচবে সে। ইভেন উইদাউট গীতাদি। 

খাজুরাহ!

ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে, শীতের মিঠে আমেজটা উপভোগ করছিল নন্দিনী। গতকাল দুপুরে ঝাঁসি থেকে ট্রেনে খাজুরাহ পৌঁছেছে। কাল সারাদিন হোটেলের বিছানায় শুয়েই কেটেছে। ট্রেন জার্নির ধকলে বেশ ক্লান্ত লাগছিল। বিছানায় শুয়ে হোটেলের লবি থেকে পাওয়া ব্রশিওরগুলো উলটেপালটে দেখছিল। ৯৫০ থেকে ১০৫০, এই একশো বছরের মধ্যে, মধ্য ভারতের চান্ডেলা রাজপুত রাজারা নাকি ৮৫ খানা মন্দির তৈরি করে। এখন ২২ খানা অবশিষ্ট রয়েছে। চান্ডেলারা নাকি বিশ্বাস করত জৈবিক ক্ষুধার পূর্ণতায় তান্ত্রিক মতে অসীমের কাছাকাছি পৌঁছনো যায়। আবার অনেকের মতে, ব্রহ্মচর্য থেকে জাগতিক গৃহী হওয়ার পথ প্রদর্শক হিসেবে, এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়। 

“কাল থেকে তালিম শুরু” ভেজানো দরজাটায় টোকা না দিয়ে দুম করে ঘরে ঢুকেই বলল নাট্টুভানারস ঋতব্রত। 

নন্দিনী ভাবেনি আচমকা এভাবে কেউ ঘরে ঢুকবে। তাড়াতাড়ি নিজেকে গুছিয়ে নিল। সুতির নাইটিটা ঠিক করে উপর হওয়া দেহটাকে ব্রশিওরগুলো থেকে সরিয়ে উঠে বসে বলল “ঠিক আছে স্যার”

“ঠিক সকাল সাতটায়” ঋতব্রত বলল। তারপর ব্রশিওরগুলোর দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বলল “কী দেখছিলে?”

“এই খাজুরাহর নো হাউ”

“ইরটিক। তাই না?”

“আমি ইতিহাসটা পড়ছিলাম”

“ইতিহাস জানতে এখানে কে আসে? সবাই তো ওই ইরটিক স্কাল্পচার দেখতেই আসে”

“আমি কিন্তু খাজুরাহ ডান্স ফেস্টিভ্যল অ্যাটেন্ড করতে এসেছি” নন্দিনীর একটুও ইচ্ছে ছিল না সদ্য পরিচিত ঋতব্রত ভাণ্ডারীর সঙ্গে গুলতানি করার।

“সে জন্যই তো আমাদের এখানে আসা” ঋতব্রত বসবার উদ্যোগ করতেই নন্দিনী উঠে পড়ল। 

“সারাদিনের ট্রেন জার্নিতে বেশ ধকল গেছে। স্নান করতে যাব। ভাববেন না স্যার। পাক্কা সাতটায় কমন রুমে পৌঁছে যাব”

এর পরে ঘরে থাকলে অসৌজন্য প্রকাশ পায়। উপায় না দেখে ঋতব্রত ভাণ্ডারী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মনে মনে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল নন্দিনী। স্নান না ছাই। সন্ধেবেলা এক আধা পরিচিত লোকের সঙ্গে হোটেল রুমে বসে খাজুরাহর ইরটিক স্কাল্পচার নিয়ে গল্প করার কোনো ইচ্ছেই তার নেই। 

উঠেই যখন পড়েছে, আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। এতক্ষণ যে ভাস্কর্যের ছবি দেখছিল, মেয়েদের স্বভাবসিদ্ধ কৌতূহলে, সেই ছবির সঙ্গে নিজের দেহের গঠনটাও মেলাবার চেষ্টা করছিল। বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে নিজের মুখটা দেখল। মসৃণ গালে মেক আপ ছাড়া কোনো ব্রণর দাগ চোখে পড়ল না। চুলটা কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছে। চোখের নীলচে আভায় যেন সমুদ্রের ঘোর লাগানো মাদকতা। উদাসীন চোখ দুটো যেন সাগরের ব্যাপ্তিকে স্নিগ্ধ শান্ত নিবিড় দৃপ্ত চাহনিতে ভেদ করতে চাইছে। ছোটবেলা থেকেই ডান দিকের নীচের চোখের পাতাটা একটু বেশি ঝোলা। যৌবনে পাড়ি দেওয়ার সময় এ নিয়ে একটু বিচলিত ছিল। এখন আর বড় একটা ভাবে না। মেদুর চোখের চাহনি যেন চোখের পাতার অসংলগ্নতাকে আড়াল করে দিয়েছে। পাতলা ঠোঁটের ওপর নাকের টিপটা মুখ আন্দাজে একটু ভারী। এক সময় রাইনোপ্লাসটি করাবে বলে প্লাস্টিক সার্জেনের কাছেও গিয়েছিল। উনি করতে চাননি।

“সেবেসিয়াস স্কিনে রাইনোপ্লাসটির রেসাল্ট ভাল হবে না”

পয়সা বেঁচে গিয়েছিল বটে। কিন্তু নাকের আদল নিয়ে মনে একটা খুতখুতানি থেকেই গেছে। সৌন্দর্যের মধ্যে ওটাই যেন একটা বেসুরো রাগ। নিজেকে সান্ত্বনা দেয় – এমন তো কোনো মহিলা নেই, যে পিকচার পারফেক্ট। কাছ থেকে দেখলে প্রত্যেকের মধ্যেই কিছু অসংলগ্নতা খুঁজে পাওয়া যাবে। মুখের সৌন্দর্য থেকে দৃষ্টিটা নেমে এল দৈহিক গঠনের দিকে। ব্রেস্টটা বরাবরই একটু শিথিল। আন্ডারওয়ার্ড ব্রা দিয়ে তাকে ওপরে টেনে ধরে রাখতে চাইলেও বাইরের দিকে আরমপিটের দিকটা বিশ্রী ভাবে ফুলে ওঠে। বিদ্রোহটা বহিরমুখি না হয়ে অন্তরমুখি হলে, ওই ব্রশিওরের ছবিগুলোর মতোই তা আরও পুষ্ট, পরিপূর্ণ ও ভরাট লাগত। প্রায়শেই মনে হয়, ব্রেস্ট অগমেন্টেশন করিয়ে নিলে হয়ত ওপরে ভরাট হলে আরও বেশি মাধুর্য আসবে। কিন্তু অত টাকা তো নন্দিনীর নেই! বাবা তো দেবেনই না বখে যাওয়া মেয়েকে। 

“শেষ পর্যন্ত কোনটা করবে ঠিক করলে?” রিহার্সাল রুমে ঋতব্রত নন্দিনীকে প্রশ্ন করল।

“ভরনম” সারা রাস্তা এই নিয়ে ভেবেছে নন্দিনী।

“তাহলে তো পাদ ভরনম করতে হয়। পাদ ভরনমে গায়কিটা অনেক প্রাধান্য পায়”

“আপনি যা বলেন স্যার” লাল সালওয়ার কামিজটা ঠিক করতে করতে নন্দিনী বলল। 

“সেটা তো অনেকক্ষণের। আধ ঘণ্টা দম রাখতে পারবে?”

“পারব স্যার” নন্দিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

“তাহলে আদি তাল, যা আট বোলের, আর আট তাল, যা চৌদ্দটা বোলের, তফাতটা আগে বোঝার চেষ্টা কর”

“নিশ্চয়ই স্যার। আমি পূর্বাঙ্গ ও উত্তরাঙ্গ সম্বন্ধে একটু একটু জানি”

“কী জান?”

“স্যার পূর্বাঙ্গ প্রথম ভাগটা। পল্লবী, মুক্ত পল্লবী আর চিত্ত সরস দিয়ে তৈরি”

মনে মনে খুশি হল ঋতব্রত। মেয়েটা বেশ কিছু জানে। লক্ষ করছে ভেতরে একটা জেদও আছে। 

“আর উত্তরাঙ্গ?”

“চরণম আর চরণ সরস”

“মন দিয়ে শোন। যে অর্ডারে আমি নাচটা তালিম দেব তা হচ্ছে, পল্লবী কিংবা অনুপল্লবী, মুক্তাই স্বরনম, এরপর পল্লবীটাকে ডবল স্পিড আর ট্রিপল স্পিডে নাচতে হবে, তারপর আমরা চলে যাব চরণম-এর আটটা গ্রুপে। পারবে?”

“আপনি শিখিয়ে দিলে নিশ্চয়ই পারব স্যার”

সকাল থেকে লাঞ্চটাইম। এক নাগাড়ে তালিম নিয়ে চলেছে। ভুল হলে ঋতব্রত থামিয়ে দিয়ে আবার রিপিট করাচ্ছে। গীতাদি তাকে রিফিউস করেছে। তাকে প্রমাণ করে দেখাতে হবে, সে কোনো অংশে কম নয়। 

ঋতব্রত শুধুই বোলের সঙ্গে নন্দিনীর হাত ও পায়ের মুভমেন্টস দেখছে না, নন্দিনীকেও দেখছে। খাজুরাহ ডান্স ফেস্টিভ্যলে আগেও বহুবার এসেছে অনেক ছাত্রী নিয়ে। কিন্তু এর আগে নন্দিনীর মতো জীবন্ত খাজুরাহ কখনও পায়নি। যখন সামনে জীবন্ত খাজুরাহ, বাইরের ভাস্কর্য দেখে কী হবে? 

খাওয়ার পর ঋতব্রত বলল “এখন কী করবে?”

“একটু ঘুমিয়ে নিই স্যার”

“তাহলে আমরা পাঁচটা থেকে আবার রিহারসল শুরু করব”

“চারটে থেকে করলে অসুবিধা হবে? আরেকটু বেশি সময় পাওয়া যাবে। আমি তো রিসেন্টলি তেমন ফর্মাল ট্রেনিং-এর মধ্যে নেই। একটু বেশি তালিম দিলে যদি আরেকটু ভাল করতে পারি”

“বেশ। চারটের সময় রিহারসল রুমে চলে এস”

খাজুরাহর চিত্রগুপ্ত মন্দির আর বিশ্বনাথ মন্দির চত্বর সেজে উঠেছে বছরের নৃত্য মধুর নেশায় বিভোর হতে। চিত্রগুপ্ত মন্দিরের সামনে যে পাথর বসানো বিশাল জায়গাটায় চেয়ার পাতা রয়েছে, সেখানে ঋতব্রত স্যারকে বসতে বলে নন্দিনী বলল “স্যার, আপনি একটু বসুন। আমি একটু ঘুরে দেখে আসছি”

“আমি যাব তোমার সঙ্গে? তুমি তো এই মন্দিরের সব দিক চেনো না”

ঋতব্রত স্যার সঙ্গে থাকলে আবার ইরটিক আর্ট সম্বন্ধে লেকচার দিতে শুরু করবে। রিহার্সালের সময় স্যারের চোখের চাহনি দৃষ্টি এড়ায়নি নন্দিনীর। স্যারকে ভাস্কর্যের মাধুর্য বর্ণনা করার অবকাশ না দিয়েই বলল “না স্যার। আমি একাই দেখে আসি”

কী যে ভাল লাগছে! ভাবতেও পারেনি এখানে কোনোদিন নাচবার সুযোগ পাবে। জেতা কিংবা হারাটা বড় কথা নয়। নন্দিনীর মতো নভিস-এর এই প্রেস্টিজিয়াস ফেস্টিভ্যলে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পাওয়াটাই বড় কথা। 

কী সুন্দর এই চিত্রগুপ্ত মন্দিরের ভাস্কর্যের কারুকাজ। মন্দিরের আসল অংশ কিঞ্চিত উঁচুতে। দুটো ধাপে সিঁড়িগুলো সাজানো। প্রথম তেরো ধাপ পেরিয়ে একটু সমতল। সেক্ষণে পিংক-গ্রে-হলদে মেশানো পাথরগুলো, তার এই যাত্রার তপস্যাভূমি। সেখানে এখন এই বর্ণাঢ্য নৃত্য সমারোহের আয়োজন চলেছে। এরপর আরও তেরোটা সিঁড়ির ধাপ বেয়ে মন্দিরে প্রবেশ করতে হয়। তেরোটা সিঁড়ি কেন? প্রশ্নটা বারবার উঁকি দিলেও এ প্রশ্নের উত্তর ক’জন দিতে পারবে বলা মুশকিল। পরে কাউকে জিজ্ঞেস করে নেওয়া যাবে। এখন তো ভেতরে যাওয়া যাবে না। 

আসল মন্দিরটা অন্যান্য মন্দিরের মতোই। অনেকটা স্পুটনিকের আদলে। নন্দিনীর মনে হল, প্রতিটা মন্দিরের চূড়া হয়ত কোনো উপগ্রহ থেকে আসা উৎকৃষ্ট জীবদের নিদর্শন। একবার মনে হল, হয়ত এই মন্দিরের চূড়াগুলো ঠিক শিবলিঙ্গের মতো। পৌরুষের বহিঃপ্রকাশ। পৌরুষকে পূজা করাই আমাদের সব ধর্মে শিখিয়েছে। অবলা নারী চিরকালই অবদমিত থেকে গেছে এই পৌরুষের অহং-এ, যতই নারী স্বাধীনতা নিয়ে আন্দোলন করুক না কেন।

একের পর এক নাচ হয়ে যাচ্ছে। ভরতনাট্যম, কত্থক, কথাকলি, মণিপুরি, কুচিপুরি, ওডিসি, মহিনাট্যম। এদের দেখে নন্দিনীর ভয় করতে লাগল। পারবে তো? মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল প্রাইজ পাক চাই না-পাক, এই আসরে নিজেকে মলিন হতে দেবে না। 

ঋতব্রতর দিকে তাকিয়ে বলল “স্যার কাল থেকে আর সকালে আসব না। আরও বেশি করে তালিম নেব”

“আমাদের প্রোগ্রাম তো আরও দুদিন পরে”

“হ্যাঁ স্যার। দুদিন আরও বেশি করে তালিম”

নন্দিনীর একাগ্রতা দেখে খুশি হল ঋতব্রত। মেয়েটার দম আছে বটে। শুধু দম-ই নয়, চেষ্টার কোনো খামতিও নেই। সবাই সব কিছুতে মাস্টার নাও হতে পারে। চেষ্টা করতে বাধা কোথায়? নন্দিনীর প্রতি আকর্ষণটা আরও গাঢ় হচ্ছে। এতদিন শুধু ওর দৈহিক ভাস্কর্যের প্রতি সীমিত ছিল। এখন নিতম্ব থেকে স্তনভাণ্ডের সম্ভার ছাড়িয়ে, ক্রমশ ওর অন্তরে প্রবেশ করতে চাইছে। ঋতব্রত বেশ বুঝতে পারছে, মানুষের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুটা সামগ্রিক। জৈবিক আকাঙ্ক্ষা সংযত করা গেলেও, সামগ্রিক আকর্ষণকে থামানো বড়ই কঠিন। 

পড়ন্ত শীতের ঝরন্ত বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাস রিফ্রেশড নন্দিনীকে মাতিয়ে দিয়েছে বিশ্বনাথ মন্দিরের প্রাঙ্গণে। আজকেই তার দিন। তাকে শ্রেষ্ঠ পারফর্ম্যান্স দিতে হবে। নাউ অর নেভার। গীতাদিকে দেখিয়ে দেবে সে কোনও অংশে কম নয়। ঘোরে নেচে চলেছে নন্দিনী। পল্লবী থেকে অনুপল্লবী থেকে মুক্তাই স্বরনম থেকে চরণম। একটা মাদকতা। একটা সতেজতা। সারা দেহের প্রতিটা অনুষ্টুপ দিয়ে আঁকতে চাইছে বোল-সংগম-মৃদঙ্গমের চৌদ্দ তালের অর্ঘ্য। যেন সম্পূর্ণভাবে নিজেকে সঁপে দিয়েছে শিবের বন্দনায়। এ যেন বিশ্বনাথ মন্দির প্রাঙ্গণ নয়, দেবরাজ ইন্দ্রের মেহফিল। সে আর নন্দিনী নেই। হয়ত সে মেনকা, উর্বশী কিংবা রম্ভা। যার প্রতিটা শৈলী ছড়িয়ে পড়ছে রঙিন আলোর বর্ণচ্ছটায়। সুর-তাল-ছন্দ মিশে গেছে দেহের ভঙ্গিমার পরিপূর্ণ জৌলুসের পরিস্ফুটনে, বোলের বৃন্দে নৃত্যের তালে তালে। 

নতুন ক্যানভাসে আঁকতে চাইছে এক অচেনা ছবি। নন্দিনীর না-দেখা নতুন ছবি। চিত্রকর সে। আবার চিত্রপটও সে। চিত্রকর আর চিত্রপট যেন এক হয়ে গেছে নতুন তুলির টানে। রূপ, রস, শব্দ, ছন্দ, বর্ণ – সব যেন মিলেমিশে একাকার, এক নতুন রং-এর জাদুর মায়াজালে। 

“খুব ভাল নেচেছ” আচমকা হোটেলের ঘরের দরজা খুলে ঋতব্রত ঢুকল।

নন্দিনী সবে মেক আপটা তুলে নিজেকে রিফ্রেসড করতে বাথরুমে ঢুকছিল এই ধকলের পর। এখনও ঘোর কাটেনি। কিছুটা আবগ, কিছুটা উন্মাদনা, কিছুটা পর্যালোচনা, সব রং-এর সমন্বয় যেন একটা মোহময় আবেগ সৃষ্টি করেছে তার ক্ষুদ্র অনুভূতির সংগমে। 

আচমকা ঋতব্রতকে ঘরে ঢুকতে দেখে একটু অবাক হয়েছিল নন্দিনী। এর আগেও তাই করেছে। লোকটা কী অচেনা মহিলার ঘরে ঢোকার আগের শিষ্টাচারগুলো শেখেনি?

তবু ভদ্রতা বজায় রেখে বলল “থ্যঙ্ক ইউ স্যার”

“স্যার নয়… ঋতব্রত দা”

“ওই একই হল”

নন্দিনী একটু একা থাকতে চাইছিল। কিন্তু এখন বোধহয় তা আর সম্ভব নয়। কিছুটা কৃতজ্ঞতা বোধে ঋতব্রতকে এখন অবহেলা করা সমীচীন নয়। আফটার অল ঋতব্রতর জন্যই সে মনোমতো পারফরমেন্স দিতে পেরেছে। 

ঋতব্রত ডেস্কের সামনের চেয়ারে বসে। নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলল “মাসেণ্ট উই সেলিব্রেট?”

নন্দিনী চুপ করে তাকিয়ে আছে ঋতব্রতর দিকে। ঘোর থেকে বেঘোরে আসবার সময় নিচ্ছে। নন্দিনী এখনও জানে না সে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। জিতেছে না হেরেছে? 

এই দ্বন্দ্বের মধ্যে যখন সে দোদুল্যমান, ঠিক সেই মুহূর্তে ঋতব্রত নন্দিনীর ঘরের ফোনটা তুলে বলল “হুইস্কি মিলেগা? টিচার্স? এক বোতল ভেজ দো ঔর বেয়ারা কো… মেনু কার্ড লেকে…” তারপর নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলল “আজকে এখানে আমরা সেলিব্রেট করব। টু ইওর গুড লাক” একটু থেমে বলল “চিন্তা করো না। বিল টা আমিই পে করব”

মেনে নেওয়া ছাড়া নন্দিনীর আর বিশেষ কিছুই করার ছিল না। আজকের দিনে যদি স্যার তাকে ট্রিট দিতে চায়, না বলার তো কোনো অবকাশ নেই! আর বলবেই বা কেন? আজকে তো আনন্দের দিন। আজকে তো স্বপ্ন পূরণের একটা মুহূর্ত। আজ গুরু বন্দনার দিন। তার ক্ষুদ্র শখের মজলিসের পূর্ণতার স্বাক্ষর। 

হুইস্কি এল। বেয়ারা এল। খাবার অর্ডার হল। নন্দিনী নিজেকে রিফ্রেসড না করেই গুরুর তালে ছন্দ মেলাল। আফটার অল পূজার দিনে কী পূজারিকে অবহেলা করা যায়! কখনওই নয়। সূর্যের বন্দনা গানে উচ্ছ্বসিত হলে এই দিনটা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকত। কিন্তু শিবের উপাসনা যেন ফেলে আসা বিশ্বনাথ মন্দিরের রেশ টানতে চাইছে। 

নন্দিনী গুরুর ছন্দে পা মিলিয়েছে। আজকের উৎকর্ষ, পারফরমেন্স, ঋতব্রত স্যারের সাহায্য না পেলে কখনই হত না।

“বুঝলে নন্দিনী, এই খাজুরাহ ডান্স ফেস্টিভ্যলে এর আগেও বেশ কয়েকবার এসেছি। কিন্তু এবার তোমার আসাতে এটা অন্য মাত্রা পেয়েছে”

নন্দিনী চুপ করে বসে আছে। 

ঋতব্রত বলে চলছে “মন্দিরের ভাস্কর্য দেখে কি আর মন ভরে? কতগুলো প্রিমিটিভ মূর্তির ইরটিক লীলাখেলা। বোধহয় এখান থেকেই গ্রুপ সেক্স-এর কনসেপ্টটা শুরু। শ্রী কৃষ্ণের গোপিনীদের নিয়ে লীলা মাহাত্ম্য। এখানে তো আর গোপিনী নেই। কেবল তুমি ছাড়া” একটু থেমে হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে বলল “আমি সুন্দরের পূজারি… তোমার সৌন্দর্যের পূজারি”

অস্বস্তিতে নড়ে বসল নন্দিনী। ঋতব্রতর কথাগুলো যেভাবে মোড় নিচ্ছে, একটুও ভাল লাগছে না। ঠিক কী করবে, বুঝতে পারছে না। সৌজন্য বজায় রেখে খাওয়ার মাঝখানে স্যারকে চলে যেতে বলতে পারে না। 

কথাটা ঘোরাবার জন্য বলল “স্যার আপনার কী মনে হয় আমার কোনও চান্স আছে? আমার নাচটা তো দেখলেন”

“কী করে বলি বল? আমি তো আর জাজ নই। আমি জাজ হলে তোমাকে ফার্স্ট করে দিতাম। এমন ভরাট চেহারা, এমন দৃপ্ত ভঙ্গিমা, এমন শার্প চোখের চাহনি, যেন বিশ্বনাথ মন্দিরে শিব আরাধনার কথা মনে করিয়ে দেয়। তোমারা উপোস করে শিব লিঙ্গে দুধ ঢাল। কখনও ইচ্ছে হয় না জীবন্ত শিবলিঙ্গে দুধ ঢালতে?”

“কী সব যা তা বলছেন স্যার। জীবন্ত শিবলিঙ্গে দুধ ঢালতে যাব কেন?”

“কেন নয়? পাথরের মধ্যে কী দেব বন্দনা সম্পূর্ণ হয়? মানুষই তো ঈশ্বরের প্রতিবিম্ব। সব আরাধনার শেষ আরাধনা এই মানুষ। সবার ওপরে মানুষ সত্য তাহার উপর নাই। বিশ্বনাথ মন্দিরে তোমার আজকের শিবের পূজা এখন সম্পূর্ণ করবে না?” বলতে বলতে চেয়ার থেকে উঠে এসে, খাটে বসা নন্দিনীকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেল।

“কী করছেন স্যার!” নন্দিনী নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য বিছানায় রোল করে অন্য প্রান্তে যাওয়ার চেষ্টা করল। তখনই ঋতব্রত স্যার নন্দিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পরল। দুহাত দিয়ে চেপে ধরেছে নন্দিনীকে। সারা দেহ নন্দিনীর দেহের ওপর ছড়িয়ে দিয়েছে। নন্দিনী সমস্ত শক্তি দিয়েও তাকে সরাতে পারছে না। 

আর তো দেরি করা যায় না। ঋতব্রতর হাত দুটো নন্দিনীর দেহে খেলে বেড়াচ্ছে। নন্দিনীর হঠাৎ গা টা রি রি করে গুলিয়ে উঠল। ঋতব্রতর ঘন ঘন শ্বাসে বমি পাচ্ছে। মানুষের পশুটাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাটা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। দেহের সব শক্তি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে। শিথিল হয়ে যাচ্ছে দেহখানা। ঋতব্রতর নেশা মাথা থেকে নীচের দিকে ঘনীভূত হয়ে পতাকার উত্তরণ ঘটাচ্ছে দৃপ্ত বলিষ্ঠ মুক্ত স্বাধীনতায়। যেন মন্দিরের চূড়া তার নিম্নভাগে সদর্পে ইহলোকের জীবন্ত পূজা চাইছে। অনুরোধ নয় – চিরায়িত ধর্মের মতো দৃপ্ত অহংকারে। ঠিক যুগ-যুগান্তরের রক্ষকের আছিলায় ভক্ষকের বেশে। 

আর সবুর করা নয়।

দেহের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কম্পন, লালসার জাগরণ – টিচার্স হুইস্কি মাথায় এক ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে সুনামি ছড়াচ্ছে। সেই উড়িয়ে দেওয়া ঝড়ের উদ্দাম স্রোতে হারিয়ে যেতে যেতে নন্দিনী হঠাৎ অনুভব করল, হাল-দাঁড়-হীন ভেসে যাওয়া নৌকোর মতো, তারও আর কোনো ক্ষমতা নেই। সে এক ঘূর্ণিঝড়ের আবর্তে দিশাহারা। প্রাণপণে চেষ্টা করতে লাগল তার হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতাকে ফিরিয়ে আনার। শেষ বারের মতো। 

আরেকবার আজকের দিনে। শুধু এই মুহূর্তটুকু…

খাজুরাহর মন্দিরের ভাস্কর্যের তৃপ্তি, তার নিজের প্রতিটা কোষে নতুন চিহ্ন এঁকে দিতে চাইছে, বর্তমানের ঔদ্ধত্যে। যদি ঋতব্রত পূজারি হয়, নন্দিনী তবে দেবদাসী। মুক্তি চাই! মুক্তি চাই! নিজের শিবকে ভাসিয়ে দিতে চাইছে নন্দিনীর দুধ সাগরে। নন্দিনী  হারিয়ে যাচ্ছে… অতল সমুদ্রের গভীরে… শিথিল যন্ত্রণার সীমাহীন গহ্বরে… সব বাধা ভেঙে ঋতব্রতর পৌরুষ যেন সেই আকাঙ্ক্ষিত গহ্বরে মহা সমারোহে শিবরাত্রি উদযাপন করতে চাইছে গুরু বন্দনার সপ্তম নিখাদে।

প্রবল ঝড়ের মধ্যে বিশাল নদীতে ছোট্ট নৌকা যেমন দিশেহারা, ওলটপালট হয়ে যায়, ঋতব্রতর বলিষ্ঠ দাপটে, নন্দিনীর পালছেঁড়া নৌকো তেমনি দিশাহারা। ঋতব্রত নন্দিনীকে আঁকড়ে ধরে উচ্ছ্বাসের অন্য মার্গে ভেসে যেতে চাইছে। শুধু প্রবেশ দ্বারের ছিটকিনি খোলাটাই বাকি! সে আর নন্দিনীকে দেখতে পারছে না। তার কাছে নন্দিনীর সুতিহীন দেহটাই যেন সূর্য মন্দিরের আরাধনার বন্দনা গান। জীবন্ত খাজুরাহ। 

বৃথাই…

তার কানের কাছে হিসহিসিয়ে বয়ে চলেছে ঋতব্রতর দ্রুত শ্বাসের বিষধর কেউটের ফণা। কিছুই করার নেই। এলোমেলো ঝড়ে তার দেহের নৌকা টালমাটাল। কিন্তু হাজার চেষ্টা করেও সে আর দাঁড় বাওয়ার শক্তি খুঁজে পেল না। নিথর দাঁড়হীন নৌকাটাকে সঁপে দিল ঋতব্রতর লোলুপ দেহের কাছে। ঋতব্রতর দুরন্ত শরীরী বানের কাছে সে খড়কুটোর মতো ভেসে গেল ঘূর্ণিস্রোতে। নিজের করে নিতে না পেরে, সঁপে দিল নিজেকে সেই সর্বক্ষম আসুরিক শক্তির অবাঞ্ছিত মিলনযজ্ঞে। 

ভোরের আকাশটা আর ভৈরবী গাইছে না। কনসোলেশন প্রাইজটাও যেন নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বিদ্রুপ করছে। খাজুরাহ ফেস্টিভ্যালটা ম্লান হয়ে গেছে, দুরন্ত ঝড়ের অশান্ত দাপটে। কলা-সঙ্গম মিশে তছনছ হয়ে গেছে, দেবী বন্দনার শপথ থেকে নারীত্বের অবলুণ্ঠনে। সুপ্ত প্রতিভাকে, কে যেন পদলুন্ঠিত করে সদর্পে এগিয়ে চলেছে কালহীন সময়ের খরস্রোতে। গীতাদির কাছে জিতেও, সে হেরে গেছে জীবন জোয়ারের চোরাবালিতে। 

অসহায় নারীত্ব যেন প্রার্থনা জানাচ্ছে আগামী দিনের সূর্যের কাছে ‘দোহাই তোমার… আর কেউ যেন খাজুরাহর মতো আরেকটা ভাস্কর্য না করে!’

Khajuraher Byarthata 

Advertisements

অমৃতের খোঁজে

বৃহস্পতিবার, ৪ জুলাই। 

আমেরিক্যান ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে। দিনটা আজও ভুলতে পারে না নন্দিনী। যেন স্বাধীনতার একটা অধ্যায়। শুধু আমেরিকার নয়, নন্দিনীরও। তার জীবনের কালো রং-এ লেখা রয়ে গেছে স্বাধীনতার সেই দিন। 

দিনটা শুধুই আমেরিকান স্বাধীনতা দিবস নয়। তারও…

বিয়ের বেশ কয়েক বছর পরে। তখন অনীশের কতই বা বয়স? বছর ছয়-সাত হবে।

একদিন অর্ণব এসে বলল “শিকাগো” 

“মানে?”

“ওখানে জাহাজ পৌঁছে দিতে হবে। ভাবছি নায়েগ্রা ফলসটা একবার ঘুরে দেখে আসব। এবারের ট্রিপে তুমি আর অনীশও চল-না আমার সঙ্গে”

“ক’মাস?”

“বেশিদিনের জন্য নয়। জাহাজ পৌঁছেই ফ্লাই ব্যাক করে চলে আসতে হবে। চলে আসার আগে যতটা সম্ভব আমেরিকা ঘুরে দেখে নেব। বিশেষ করে নায়েগ্রা ফলসটা”

একা বাড়িতে ঘর সামলাতে আর ছবি আঁকতে আঁকতে ক্লান্ত। একটা ব্রেক চাই। নন্দিনী উচ্ছ্বসিত। আমেরিকার সব থেকে দ্রষ্টব্য স্থানের মধ্যে একটি। আনন্দে বুকটা কেঁপে উঠেছিল। 

আগেও জাহাজে চড়েছে। তার মধ্যে আর নতুন আকর্ষণ নেই। প্রথম আমেরিকার মাটিতে পা দিয়ে একটা রোমাঞ্চ ছিল। অনীশের উৎসাহ দ্বিগুণ। জাহাজে চড়া থেকে বিদেশে ঘোরা -পাখিটা খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে খোলা আকাশে। 

অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল “এই উইকেন্ডে তো সবাই ফুর্তি করছে। চল-না এই উইকেন্ডটাই আমরা নায়েগ্রা ফলস ঘুরে আসি। পুরো উইকেন্ডটাই ওখানে কাটাতে পারব”

নন্দিনীর যেমন ছবি আঁকার নেশা, অর্ণবেরও ছবি তোলার। নন্দিনী নায়েগ্রা ফলস-এর স্মৃতি ক্যানভাসে ধরে রাখতে চায়, আর অর্ণবও ক্যামেরা বন্দি করে ফেলতে পারবে ওই মনোরম দৃশ্য। 

মন্দ কী?

অনীশ বাপির দিকে তাকিয়ে বলেছিল “হাউ লাভলি! আই অ্যাম গেটিং এক্সাইটেড অ্যাট দ্য থট”

অনীশ কেন? মনে মনে ওরা তিনজনেই এক্সাইটেড। নায়াগ্রার কথা এত শুনেছে। আমেরিকাতে এসে আর কিছু দেখা না হোক, নায়েগ্রা ফলস না-দেখে গেলে, যাত্রা অসম্পূর্ণ।

বৃহস্পতিবার সকালে সবার আগে সাওয়ারে ঢুকে পড়ল নন্দিনী। যাওয়ার আগে অনেক কাজ বাকি। অর্ণব স্বাভাবিকভাবে সেগুলো ভুলে যায়। সেগুলো তো গুছিয়ে নিতে হবে। অনীশ তো স্বপ্নের আনন্দে আত্মহারা।

“ক্যামেরাটা নিয়েছ?” অর্ণব বাইরের ঘর থেকে হাঁকল “আমার হ্যন্ডব্যাগে ওটা নিয়ে নাও”। যাওয়ার আনন্দে ছবি তোলার নেশাটা আরও বেশি করে চাড়া দিয়ে উঠেছে।

নন্দিনীর তো সঙ্গে করে কিছু নিয়ে যাওয়ার নেই। শুধু মনের ক্যানভাসে ধরে রাখার জন্য একটা নির্মল মন নিয়ে গিয়ে দুচোখ ভরে দেখে আস্বাদন করতে হবে তার রূপ, রস, বর্ণ মুহূর্ত টুকুকে। পরে ইন্ডিয়াতে ফিরে যাতে স্মৃতির জলছবি আঁকতে পারে মনের ক্যানভাস থেকে।

“উফঃ! অত চিৎকার করার কিছু নেই। যাওয়ার আগে সবকিছু ঠিক করে নেব। লেট মি হ্যভ মাই বাথ ফার্স্ট” নন্দিনী অর্ণবের ফোপরদালালিতে একটু বিরক্তই হল।

“মম… ক্যন আই ক্যরি মাই আইপ্যড প্লিজ?”

নন্দিনী উত্তর দিল না। ততক্ষণে সে সাওয়ারে।

দু-ঘণ্টার ফ্লাইট। শিকাগো থেকে বাফেলো।

অর্ণব নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলল “উই হ্যভ লস্ট টু আওয়ার্স” – নিউ ইয়র্ক শিকাগো থেকে এক ঘণ্টা আগে।

নন্দিনীর হাতে চাপ দিয়ে অর্ণব বলল “হাউ অ্যাম আই গোয়িং টু টেক কেয়ার অফ দ্য জেট ল্যগ নন্দিনী?”

ইন্ডিয়া থেকে এলে টাইমের গন্ডগোলে সব কিছু ওলটপালট হয়ে যায়। শিকাগোতে কয়েকদিন কাটিয়েছে। এখনও ধাতস্থ হতে পারেনি।

যখন শিকাগোতে পৌঁছল, তখন দুপুর আড়াইটে। অর্ণব হার্টজ কার রেন্টাল থেকে গাড়ির চাবিটা নিতে যাচ্ছিল। পেছন থেকে নন্দিনী বলল “হওয়াই ডোন্ট ইউ গেট এ কার উইথ জিপিএস?” 

“দে ডোন্ট হ্যভ ইট রাইট নাও নন্দিনী। বাচ্চার মতো করো না। হোটেলটা এখান থেকে বেশি দূর নয়”

অনীশ গাড়ির পেছনের সিটে বসে বলল “ড্যড আই অ্যাম হাংরি। ক্যন আই হ্যভ সাম নাট-নাগেটস প্লী…জ…?”

“ইয়েস… বাট নো সোডা” অর্ণব ড্রাইভিং হুইলে বসতে বসতে বলল। 

একটু অস্বস্তি লাগছিল। ইন্টারন্যশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে এলেও জায়েগাটা তার অপরিচিত। ক’দিন শিকাগোতে চালিয়ে হাতটা একটু রপ্ত করে নিয়েছে। এদেশে ঘুরতে হলে নিজেকেই গাড়ি চালাতে হবে। এ তো আর ইন্ডিয়া নয়! যে সেফর ড্রিভেন কারে কেউ তাকে ঘোরাবে!

“অনীশ ডু ইউ রিমেম্বার হোয়াট ইউ হ্যভ প্রমিসড?”

“হোয়াট?”

“তোমার মাতৃভাষা কী?”

“বাংলা”

“আমরা বাংলায় কথা বলি। নয় কি?” নন্দিনী সিট বেল্ট লাগিয়ে অর্ণবের পাশের সিটে বসে বলল। 

অনীশ এই কদিনেই গলগল করে ইংরেজি বলছে। শেষে দেশে ফেরত যাওয়ার আগেই না বাংলাটা ভুলে যায়! বয়েসটাকে তো বিশ্বাস নেই। এই বয়সে বাচ্চারা যা পারে তাই হজম করে নেয়। তাও আবার আমেরিকান সভ্যতা বলে কথা! নিজের দেশকেই পাঁচ মেশালি বিদেশ করে ছাড়ল। আর বিদেশে এলে তো কথাই নেই। দেশকে ভুলতে কতক্ষণ?

পরের দিন অনীশ আরও উৎফুল্ল। কাল রাতে ড্যড কথা দিয়েছে ওকে হেলিকপ্টারে চড়াবে নায়াগ্রা ফলস-এর ওপর। এর আগে কখনও হেলিকপ্টার চড়েনি অনীশ। মনে মনে একটা রোমাঞ্চ অনুভব করছিল। নন্দিনীর খুব ইচ্ছে ছিল না। অমন উঁচুতে। একটু ভয় ভয় করে… কিন্তু সেকথা অনীশকে বোঝানো যাবে না।

তখন সকাল এগারোটা। ওরা তিনজনে হেলিপ্যডের দিকে হাঁটতে শুরু করল। আগে ওজন নিয়ে কপ্টারে ঢুকতে হবে যে! কিছুক্ষণের মধ্যে কমলা রঙের হেলিকপ্টারটা আকাশে হারিয়ে গেল। কোথায় যে হেলিপ্যডটা ফেলে এসেছে চারিদিক ঘুরে দেখতেও পেল না অনীশ।

অনীশ পেছনে মায়ের পাশে বসে ছিল। বাঁ হাতটা মুঠো করে, ডান হাতটা মায়ের হাতে জড়িয়ে দুরু দুরু বুকে সামনে তাকিয়েছিল। অর্ণব পাইলটের পাসে বসে মুচকি মুচকি হাসছিল।

“আমরা স্বর্গের কাছাকাছি!” 

কপ্টারটা ফলস-এর ওপর ঘুরপাক খেতে অর্ণব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অনেকদিনের স্বপ্ন। বহুদিনের স্বপ্নকে আজ কাছ থেকে পাওয়া। ছোটবেলা থেকে কত পড়েছে। সেই স্বপ্নের স্বর্গ আজ চোখের সামনে।

নীল আকাশের বর্ণচ্ছটায় জলপ্রপাতের ঘনঘটা। মুহূর্তটা যেন নির্বাক হয়ে থেমে। সেই চোখ জুড়ানো বর্ণ নন্দিনীর দুচোখে। হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টিতে মহাশূন্যের দিকে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে অর্ণব বলল “জলের রংটা কী?”

অর্ণব-এর কথা টেনে নিয়ে নন্দিনী বলল “সাদা? না গ্রে? না কি নীল?”

দৃশ্যটা নিজের মনের ক্যানভাসে ছবি করে রাখতে চাইছে। পরে দেশে ফিরে সেই রং-এর অ্যাক্রিলিক ব্যবহার করতে পারবে। ছবিটাকে স্পষ্ট ধরে রাখতে চাইছে মনে। নিখুঁত রং। যাতে তার প্রকাশের মধ্যে কোনো খামতি না থাকে। রং-টা চিরপরিচিত না হয়ে বাস্তব হওয়াটাই আবশ্যক।

“নীল” অনীশ বাবা মায়ের কথায় যোগ দিয়ে সরবে বলল “দেখ দেখ, আমি কিন্তু বাংলাতেই বলছি”

অর্ণব জবাব দিল না। ব্যাগ থেকে ক্যামেরা বার করে কন্টিনিউয়াস মোড দিয়ে ধুপ-ধাপ ক্লিক করতে লাগল। এটুকু সময় যত ছবি তুলে রাখা যায়।

ছোটবেলা থেকেই অর্ণবের ফটোগ্রাফির অসম্ভব নেশা। কলকাতার ভিখিরি থেকে বর্ষাস্নাত এসপ্ল্যানেডের মেট্রো চত্বরের ছবি আজও বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে আছে কলকাতার বাড়িতে। তখন তো আর ডিজিট্যল ক্যমেরা ছিল না। অনেক কষ্টে টাকা জমিয়ে একটা নিকন এস এল আর কিনেছিল। এই মুহূর্তে সেকথা মনে করতে চায় না। যুগটা পালটে গেছে। নন্দিনী তখন জীবনে আসেনি। অনীশ তো নয়ই।

এখন আরেক পৃথিবী। তবুও ছেলেবেলার অভ্যসটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ব্যাপ্তির মধ্যে নতুন সুর খুঁজছিল। আনন্দের সুর। জীবনের ভাল লাগার সুর। বিদেশে নিজেকে আবার নতুন করে পাওয়ার সুর। কেবলই মনে হচ্ছিল ছবিই যথেষ্ট নয়… 

…আরও… আরও কিছু…

এই ভাল লাগার পরিমাপটা যেন সরগম থেকে নিখাদে পেখম মেলে ভাসতে চাইছে। মুক্ত পাখির মতো। ধরা থেকে অধরাকে আঁকড়ে ধরার উন্মাদ নেশায়…

আরও… আরও… আরও… 

বিবরণহীন সৌন্দর্যের নীলিমায় হারিয়ে যেতে যেতে অর্ণবের হঠাৎ মনে হল ‘যদি এই মুহূর্তে আমি কপ্টার থেকে ঝাঁপ দিই, ও কি আমায় চুমু খাবে? যদি দুহাত মেলে ভেসে বেড়াই, তবে কি বাধাবন্ধনহীন মুক্ত পাখিদের মতোই শূন্যে উড়তে পারব? যদি আর ফেরত না যাই, তবে কী ও আমায় অ্যাকসেপ্ট করবে?”

“আর ইউ অল রাইট?” পাইলটের কথায় অর্ণব যেন স্বপ্ন থেকে ফিরে এল বাস্তব সৌন্দর্যের মখমলে।

“উই আর নাও গোয়িং ডাউন”

“ওক…কে, ওক…কে, থ্যঙ্কস!” অর্ণবের স্বর স্পষ্ট শোনা গেল।

অনীশ সারাক্ষণ ধরে যেন ভুলতেই পারছে না কপ্টার রাইডের কথা। কত প্রশ্ন। নন্দিনীর উত্তর দিতে দিতে নাভিশ্বাস উঠে আসছে। এবার একটু বিশ্রাম দরকার।

“চলো আমরা হোটেলে যাই” অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল “স্নান করে একটু ঘুমিয়ে নিই”

“তোমরা একটু রেস্ট নাও। আমি আরও কয়েকটা ছবি তুলে আসি। ফেরার পরে আমরা ইভিনিং-এ ফায়ার ওয়ার্কস দেখতে যাব”

নন্দিনী মাথা নেড়ে গা এলিয়ে দিয়েছিল।

চারটে নাগাদ অর্ণব বেরিয়ে পড়েছিল। এই মুহূর্তে কারও সঙ্গে কথা বলতে আর ভাল লাগছে না। ঘরে শুয়ে সময় নষ্ট করতেও মন চাইছিল না। ভেতরে ভেতরে একটা চাপা উত্তেজনা তাকে গ্রাস করেছিল। সেই অর্গ্যজমিক নীল তাকে হাতছানি দিচ্ছে…

বারবার!

অর্ণব ফলস-এর জলের দিকে এগিয়ে চলল। যতটা এগোনো যায়। যতক্ষণ পর্যন্ত ফলস-এর রেইলস তরুণীর হাইমেনের মতো তাকে থামিয়ে না দেয়…

…মাথাটা ঘুরতে লাগল। পা দুটো কেঁপে উঠল। একটা অস্বস্তিতে যেন মাটিটা হারিয়ে যাচ্ছে … এটা কী প্রকৃতির আমন্ত্রণ? না কী হৃদয়ের কম্পন? বিন্দু বিন্দু ঘামে ভরে গেছে প্রশস্ত কপালের আবরণ।

অর্ণব ক্যামেরার লেন্স ওয়াইপার দিয়ে কপালটা মুছল। সারা জীবনের স্বপ্নের ক্যানভাসটা এস ডি কার্ডে বন্দি করে রাখতে চায়। আঙুল কেঁপে কেঁপে উঠছে শাটারের মৃদুমন্দ তরঙ্গে। কানে ভেসে আসছে হাজার তবলার বিরামহীন লহরা। হৃদয় কেঁপে উঠছে এক নিঃশব্দ আলোড়নে।

মুহূর্তের জন্য…

কোথায় যেন মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেহটা রেলিং-এর ওপর শূন্যে ভাসছে… যেন এপার-ওপারের মাঝে দাঁড়িয়ে শুনছে একটা চেনা পৃথিবীর না-চেনা আলো-আঁধারের মিশ্র রাগ। ক্যামেরাটা হাত থেকে কালো নুড়ির মতো ফসকে পড়ল। 

…আর দেখা গেল না। 

অর্ণবের কানে দূর থেকে ভেসে আসছে হাজার মানুষের কোলাহল!

নীল মিশে গেল ধূসর থেকে অন্ধকারে…

ছবিটা আঁকতে গিয়েও আঁকা হল না নন্দিনীর। সেই ইন্ডিয়া থেকে যাকে নানা বর্ণে সাজাতে চেয়েছে চেতনার অবগুণ্ঠনের বিভোরে। সেই চেতনাটা আবছায়া মনের একটা ক্যানভাস। যেখানে জীবনের রং বারবার বর্ণহীন হয়ে যাচ্ছে। জীবনের মহা ব্যাপ্তির কালস্রোতের গতিপথ থেকে উদ্ধার করা একটুকরো মুছে যাওয়া রং। এই রং-এর রামধনুর মধ্যে কোথাও ছবিটা আছে। আছে ব্যথার একটা জলছবিও। অ্যাক্রিলিকে এঁকে লাভ নেই। কখন আবার মুছে যায়… 

কিন্তু কোথায়?

ফেসবুকে নীল ধূসর থেকে অন্ধকারে মিশে যাওয়ার একটা ছবি কম্পিউটারে এঁকে পোস্ট করে দিল। যেন তার মধ্যেই জীবনের ঝংকার খুঁজছে।

ঝংকারটাই তো জীবন!

হয়ত তা ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন আকারে। স্পন্দন জাগায় নানা রং-এর রামধনু ছড়ানো ব্ল্যাংক ক্যানভাসে। নন্দিনীর জীবনটা বোধহয় সেই চেনা ছবির অচেনা রূপ আঁকতে চাইছে এক বিশেষ লক্ষ্মণরেখার ঘেরাটোপের মধ্যেই। জাগতিক প্রাণোচ্ছল জীবনের প্রেক্ষাপটে একটা নিজস্ব বিউটি। বিউটি অ্যাট ইটস বেস্ট। আবরণে ঢাকা, ধোঁয়াশায় ঘেরা অস্পষ্ট এক স্বপ্ন!

এমন তো কোনো কথা নেই, যে সৌন্দর্যটা প্রকৃতির অ-দেখার মধ্যেই লুকিয়ে থাকতে পারে? জীবনের বৈচিত্র্যের মধ্যেও তো তাকে খুঁজে নেওয়া যায়? না-ই বা বাধা পড়ে রইল পঞ্চবটী বনের কুটিরের চারপাশে এঁকে দেওয়া লক্ষ্মণরেখায়! সে তো পুরাণের কথা। গণ্ডির বাইরে পা বাড়ালেই রাবণের হাতছানি! কিংবা মোহময় স্বপ্নের হনন।

একজন ফেসবুকে ছবিটা দেখে কমেন্ট করল “আচ্ছা, আপনি কী স্বপ্ন দেখেন?”

“কেন?”

“ছবিটা দেখে মনে হল, আপনি স্বপ্নের তুলি দিয়ে ছবিটা এঁকেছেন”

নায়েগ্রা ফলস-এর রং-এর সমন্বয় কী স্বপ্নের প্রতিবিম্ব? 

নন্দিনী তো বাস্তবের রং-টাই এঁকেছে। তার জীবনের কঠিন বাস্তব। তার জীবনের একটা অধ্যায়। 

“কেন বলুন তো?”

“রং-টা ঠিক কেমন জানি লাগছে”

কোন রং দিয়ে আঁকা হলে ক্যানভাসটা প্রাণ পাবে? বেগুনি, ঘন নীল, নীল, সবুজ, হলুদ, কমলা, না কি লাল?

ওই রংগুলোই খুঁজছে লোকটা। ধূসর আর অন্ধকারের কোনো রং তো আলাদা করে নেই। মানুষ শুধু চেনা রং-এই ছবিটা দেখতে চায়। অজানা রং নিয়ে ভাবে না। কিন্তু সেই অজানা রং দিয়েই তো জীবনের ছবি আঁকা হয়।

সে রংটা কী?

সেই রং খোঁজাই তো আসল কাজ। অথচ সবাই ভুলে যায় সে কথা। হয়তো বা ক্কচিৎ কখনো, মাঝে মাঝে কোনো নিঝুম দুপুর অথবা স্তব্ধ মাঝরাতে হঠাৎ সেই রংটা স্মৃতির মশারি সরিয়ে উঁকি মারে একটা ছোট্ট মৌটুসি পাখির মতো। ডাক দেয় কোথাও চলে যাওয়ার।

অন্য কোথাও। অন্য কোনোখানে। 

নন্দিনী স্মৃতির আলপথ ধরে জীবনের ধানখেতের মধ্য দিয়ে হাঁটতে শুরু করল, সেই অজানা অচেনা গন্তব্যের সন্ধানে।

Amriter Khonje

ক্রস রোড

“রুম নম্বর ৪৪৪”

চারতলার চুয়াল্লিশ নম্বর ঘরের দরজাটা বেয়ারা খুলে দিতেই নন্দিনীর মনে হল ডেমিয়েনের রেসারেকশন নয় তো? হলে ওমেন-এর বদলে আরও একটা সিরিস হলিউড ব্লকবাস্টার হয়ে যেত। 

মনে মনে হাসল নন্দিনী। অত কী ভাবার সময় আছে?

বেয়ারাকে টিপস মিটিয়ে দিয়ে জিনস-টপস খুলে বাথরুমে ঢুকে পড়ল। কিছুটা মুহূর্ত নিজের জন্য। তারপর মিঃ বিশ্বনাথের জন্য আসর সাজিয়ে ফেলতে হবে। সাজাতে হবে নতুন উন্মাদনার নতুন ক্যানভাস। মহামান্য অতিথি বলে কথা। ‘মহামান্য’ কথাটা মনে হতেই হাসি পেল নন্দিনীর। মহামান্য-র সংজ্ঞাটা কেমন বদলে গেছে ছোটবেলা থেকে। যে পয়সা ছড়ায়, সেই মহামান্য। সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে, নন্দিনীর কাছে যারা আসে, তারা সবাই মহামান্য। আজও এই দুনিয়ায় টাকার বিনিময় মান কেনা যায়।

এম জি রোডের দ্য ওবের‍য়-তে তো যে সে লোক আসতে পারে না! একমাত্র মিঃ বিশ্বনাথের মতো সত্যিকারের ‘মহামান্য’ লোক ছাড়া। বিজনেস ট্রিপে ব্যঙ্গালুরুতে এলেই এই ৪৪৪ নম্বর কামরা ওর জন্য বাঁধা। বাঁধা কাজের শেষে নন্দিনীর নরম হাতের প্রলেপ। নন্দিনী ইজ ইম্যাকুলেট, ইরিপ্লেসেবল ইন দ্য ইভিনিংস ইন ব্যঙ্গালুরু। নট ইভেন দ্য ইভনিং বিজনেস ডিনারস আর অ্যাজ চার্মিং অ্যাজ ডিয়ার সুইট নন্দিনী।

রেন্ডি!

কথাটা বাজারে শোভা পায়। পাঁচতারা হোটেলের সুইটে নয়। এক ঘণ্টায় দু লাখ টাকা। ফিফটি পার্সেন্ট এজেন্সিকে দিয়ে নিট এক লাখ টাকা হাতে। আর মিঃ বিশ্বনাথের মতো রেগুলার কাস্টমারের সঙ্গে সারারাত কাটাতে পারলে ডিসকাউন্ট নিয়ে আট লাখ টাকা! কম কী? তারপরেও কেউ সাহস করবে ‘রেন্ডি’ বলতে? কে বলে ইন্ডিয়া গরিব দেশ? নন্দিনীর তো মনেই হয় না।

কে কী নাম দিল, কী আসে যায়? সম্রাজ্ঞীর কী কোনও নাম থাকে? সে তো শুধুই সম্রাজ্ঞী। ভারতের উঁচু মহলের একচ্ছত্র রানি – নন্দিনী।

একটা ফিনফিনে আকাশি রঙের সিল্কের হাউসকোট পরে, ফ্রিজ থেকে বার করা বরফটাকে গ্লাসে ফেলে, ৪৪৪ নম্বর সুইটে মিঃ বিশ্বনাথের আসার আগে স্টক করা বার থেকে গ্লেনফেডিচ ঢেলে বারান্দায় গিয়ে বসল। সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে এক দৃষ্টে চেয়ে রইল আকাশের দিকে।

মেঘটা আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছে। মেঘের আড়াল থেকে পূর্ণিমার চাঁদটা আত্মপ্রকাশ করছে নিজ দ্যুতিতে। যেন শূন্যতা থেকে পূর্ণতা জানান দিচ্ছে। অন্ধকার থেকে আলোর নিশানা। হোক না সে ধার করা আলো। তবুও তো সূর্যের কিরণের প্রতিবিম্ব। সূর্যকে তাদের দুনিয়ায় ঝলসাতে দিয়ে, তার থেকে ধার করা কিরণ ছড়াবার মধ্যেও তো একটা স্নিগ্ধতা আছে।

মায়ের মুখে শুনছিল, কোনও এক পূর্ণিমা তিথিতে তার জন্ম। 

জ্যোতিষ বলছিল “শুক্লপক্ষে পূর্ণিমা তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রে ভোর চারটে চুয়াল্লিশ মিনিটে জন্ম। এ মেয়ের জীবন আলোয় আলোয় ভরে উঠবে”

বাবা বিদ্রুপ করে বলেছিল “এমন ধিঙ্গি মেয়ে, ছোট ছোট জামা পড়ে সারা পাড়া নাচিয়ে বেড়াচ্ছিস। পড়াশোনার বালাই নেই। তোকে দিয়ে কিসসু হবে না”

উঠতি বয়সের ঠিকরে পড়া দেহসৌষ্ঠব। মডার্ন ওয়ান-পিসের দৌলতে চাঁদের আলোর মতো ঠিকরে পড়ছে। সেই ছড়িয়ে পড়া পি এল লাইটের দ্যুতিতে যে তার চারপাশের অন্ধকারের মধ্যে পোকাগুলো কিলবিল করবে না, সে কথা ভাবাও ভুল। সে কিছুই করেনি। শুধু চাঁদের আলোর মতো দ্যুতি ছড়িয়েছে। সেই দ্যুতির রোশনাইয়ে যে কত হৃদয় মুখ থুবড়ে পড়ে ছটফট করেছে আলো আঁধারির বেলাভূমিতে তার হিসেব করেনি নন্দিনী। পড়ে থাকা আধমরাদের নিয়ে ভাবতে গেলে এগোনো যায় না।

ভাবেওনি!

বাবার তির্যক ব্যঙ্গ “যে ভাবে চলছিস কেউ তোকে বিয়েও করবে না। নেহাৎ মেয়ে হয়ে জন্মেছিস তাই তো ফেলে দিতে পারব না”

“তোমাকে আমার বিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমার কপালে যা আছে তাই হবে” ঝাঁঝিয়ে উত্তর দিয়েছিল নন্দিনী।

সেদিন বোঝেনি কথাটা তার জীবনে কতখানি সত্যি হয়ে দাঁড়াবে। সেকথা, প্রবহমান জীবন তাকে পরে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে। জ্যোতিষ কী অর্থে কপালটাকে দেখেছিল প্রশ্ন করার সৌভাগ্য হয়নি নন্দিনীর। 

হুইস্কিতে চুমুক দিয়ে সিগারেটটা টেবিলের অ্যাশট্রেতে নিভিয়ে মনে মনে হাসল। কোনটা যে আলো, আর কোনটা অন্ধকার, কে জানে? লেখাপড়া শিখে কয়েকটা ডিগ্রি পকেটে পুরে নন্দিনীর কি ক্ষমতা ছিল ঘণ্টায় দু-লাখ টাকা কামাবার? বাবার দেওয়া আদর্শের বুলিগুলো যতই নীতিবাগীশ হোক না কেন, কোথায় সে নীতির আলো জ্বলে, সেটা হয়ত সময়ই বলে দেবে। 

তখনও স্কুলে পড়ে। যেদিন রাতে বাড়ি ফিরে বাবার তির্যক ব্যঙ্গ শুনতে হয়েছিল “এই ধিঙ্গি মেয়ে রাতে বেশ্যাবৃত্তি সেরে বাড়ি ফিরলেন” সেদিন আর নিতে পারেনি। এনাফ ইজ এনাফ। ইট হ্যস টু এন্ড। এন্ড নাউ। দুজনের পথ ভিন্ন। 

ঈশ্বরই দুজনের পথ আলাদা করে দিয়েছিল। একা একা নিজেই পথের ধ্রুবতারা খুঁজে নিতে। 

ঘর থেকে বাইরে। নিশ্চয়তা থেকে অনিশ্চয়তায়। স্থিত চলমানতা থেকে অনির্দিষ্ট পথে হাঁটা। ‘ডিসক্রিশন ইজ দ্য বেটার পার্ট অফ ভ্যালার’। নিজেকে সেই ডিসক্রিটলি ডিসক্রিট করে তুলতে গিয়ে ছুটে বেড়িয়েছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। নদীর মোহনা এক সময় মিশে গেছে বিশাল সমুদ্রের জলরাশিতে। 

“আই উইল বি এ বিট লেট টুডে” মিঃ বিশ্বনাথের ফোন “হ্যভ ইউ রিচড দেয়ার অলরেডি?”

“ইয়েস। কোয়াইট এ হোয়াইল ব্যাক। টেক ইওর টাইম হোয়াইল আই এনজয় দ্য ফুল মুন” 

“বাই অল মিনস… গো অ্যহেড। উইথ এ ফুল স্টম্যাক।  আই কান্ট সি ইউ উইথ এ সালেন ফেস হাঙ্গারি” হাসতে হাসতে ফোনটা কেটে দিল মিঃ বিশ্বনাথ।

পেট আর তার নীচের তাড়নাতেই তো গোটা পৃথিবীটা চলছে। পার্থিব বিশ্বের মহাচক্র তো এই গোলকেই ঘুরছে। আহাঃ! বাবা যদি একথা বুঝত। নীতিকথাগুলো ঝিপ ফাইলে কমপ্রেস করে ব্যাকআপ ড্রাইভে ফেলে রাখত। নন্দিনী আজও বুঝতে পারে না এইসব সত্যমিথ্যার নীতি কোথায় লেখা হয়েছিল। কারাই বা লিখেছিল? কেনই বা? সামাজিক একটা কোহেশন আনতে! অনেক পলিটিসাইজড ধর্ম, নীতি, আচার, কৃষ্টির মতোই এটাও কী একটা সেন্স অফ কন্ট্রোলের আত্মপ্রকাশ? মানে এগো অফ ডমিন্যন্স? 

তাহলে তো নন্দিনীর এগোটা সব থেকে বেশি থাকা উচিত। এগোটাকে জাহির না করেও আন্ডার-কারেন্টের মতো একটা ডমিন্যন্স থেকে যায়। যা প্রেম, ভালবাসা, প্রীতি, সৌহার্দ্য সে ছড়িয়ে দিতে পারে মানুষের মধ্যে। উইদাউট এনি কনফ্লিক্ট।

৪৪৪ কিংবা ৬৬৬ কিংবা ডবলিউ ডবলিউ ডবলিউ।

সবই তো ডমিন্যন্স–এর শেষ কথা। কী ভাবে ডমিন্যন্সটা জীবনে খাটছে, সেটাই ভাববার। ৪৪৪-এ  ফ্রি ডবলিউ ডবলিউ ডবলিউ আছে। তাই নিয়ে খেলতে উঠে গেল নন্দিনী।

সত্যি! তার জীবনটাও তো একটা গল্প। কেউ যদি তা নিয়ে লিখত। বেশ্যাকে নিয়ে মাঝরাতে ফুর্তি করা যায়। তাকে নিয়ে কী গল্প লেখা যায়! তবুও একটা চেষ্টা করে দেখা মাত্র।

“আপনি আমায় নিয়ে একটা গল্প লিখবেন?” 

লিখবে? কেউ? সব কথা কী বলা যায়? না, বললেই লেখা যায়? গল্প তো একটা ছকের মধ্যে পড়তে হবে। তা না হলে কী গল্প হয়?

সুইটের বেলটা বাজতেই, প্রায় ট্র্যনস্প্যরেন্ট নীল হাউস কোটটা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে দরজার এপার থেকে বলল “হু ইজ ইট?” 

“হু এলস? ইটস মি” বিশ্বনাথের জন্য দরজাটা খুলে দিতেই বিশ্বনাথ ঘরে ঢুকে নন্দিনীকে চুমু খেয়ে বলল “সরি ডিয়ার… আই অ্যাম লেট” ব্রিফকেসটা ড্রেসিং টেবিলের ওপর রেখে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল “আই অ্যাম ডাইং। নিড টু পি। হ্যভ ইউ হ্যড সামথিং টু ইট?”

“নট কোয়াইট। ওয়াজ ওয়েটিং ফর ইউ। হাউ ক্যান আই উইদাউট ইউ?” 

বাঙালি মেয়ের এই ঘরণীপানা বিশ্বনাথের ভাল লাগে। তাই তো নন্দিনী অনন্যা। তার প্রফেশনাল কাজের বাইরেও একটা মানুষ লুকিয়ে আছে। সেটা বিশ্বনাথ অনুভব করতে পারে। 

ফ্লাশটা টেনে বাথরুম থেকেই বলল “দেন অর্ডার ফর সাম। মাস্ট বি কোয়াইট ফিলিং, হোয়াইল আই হ্যভ এ কুইক বাথ”

নন্দিনী রুম সার্ভিসকে ফোন করে ইটালিয়ান ভূরিভোজের অর্ডার দিল। বিবস্ত্র অবস্থায় সাওয়ার থেকে বেরিয়ে, বিশ্বনাথ নন্দিনীকে বলল “পাস মি দ্য বাথরোব ফ্রম দ্য ক্লজেট”

নন্দিনীর দেওয়া রোবটা জড়িয়ে সোফায় বসে বলল “টুডে হ্যস বিন এ হেক্টিক ডে”

হয়ত আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, নন্দিনী সিঙ্গল মল্টের গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল “রিল্যক্স”

উলটো দিকের সোফায় বসে নিজের হাফ-ফিনিসড গ্লাসে চুমুক দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল “নো নিড টু মেনশন। আই আন্ডারস্ট্যন্ড”

বিশ্বনাথ নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বলল “ইউ ওয়ার ওয়াচিং দ্য মুন ফ্রম দ্য ব্যালকনি?” 

“ইয়েস… স্য দ্য ক্লাউডস পাস টু লাইট ইট ইন অল ব্রিলিয়ান্স। হ্যভ ইউ হ্যড টাইম টু সি দ্য মুন?” 

“নট ইন রিসেন্ট টাইমস। হাউ অ্যাবাউট হ্যভিং এ মুনলিট ডিনার ইন দ্য ব্যলকনি?” 

“হোয়াই নট?”  

সদ্য আনা ইটালিয়ান ডিশ বেয়ারাকে ব্যলকনিতে রাখতে বলে গ্লাসটা ব্যলকনির টেবিলে রেখে, ডিনারটা সাজাতে লাগল। বিশ্বনাথও এসে বসল পাশের সোফায়। দুজনেরই খিদে পেয়েছে। কথা না বলে গোগ্রাসে খেতে থাকল।

শেষে রুম সার্ভিসকে তলব “সব লে জানা”

“অউর কুছ?” 

বিশ্বনাথ একটা পাঁচশো টাকার নোট ওর হাতে দিয়ে বলল “কুছ নেহি। তুম যা সকতে হো” 

বেয়ারা বেরিয়ে যেতেই বিশ্বনাথ বিছানাতে গা এলিয়ে দিল। আর বসে থাকতে পারছে না। সারাদিন ধরে মিটিং-এ বসে কোমরটা ব্যথা করছে। আড়চোখে দেখল নন্দিনীর ট্র্যন্সপ্যারেন্ট নীল হাউস কোটে মোড়া তন্বী দেহটা নিতম্ব দুলিয়ে, পেছনে দরজাটা টেনে, বাথরুমে মিলিয়ে গেল। কতক্ষণ বাথরুমে নন্দিনী ছিল সে নিজেও জানে না। বেশিক্ষণ নয়। বডি ফ্রেশনার দিয়ে নিজেকে সুগন্ধি করে ফিরে এল বিশ্বনাথের আজকের দেখা ক্যানভাসে ছবিটাকে জীবন্ত করে তুলতে। 

দেখল বিশ্বনাথ খাটে ঘুমিয়ে পড়েছে। হয়ত টায়ার্ড। কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিক। রাত তো ফুরিয়ে যায়নি। বারান্দায় গিয়ে বসল পূর্ণিমার চাঁদকে আবার দেখতে। চাঁদের অনেকখানি মেঘে ঢেকে গেছে। কয়েক ঘণ্টা আগের মতো উজ্জ্বল নয়। যেন আলো আঁধারির লুকোচুরি খেলছে। মেঘটা ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে। বৃষ্টি আসতে পারে। কত তাড়াতাড়ি না আকাশের রং পালটায়! জ্যোতিষের কথা মনে পড়ল… “শুক্লপক্ষে পূর্ণিমা তিথিতে রোহিণী নক্ষত্রে ভোর চারটে চুয়াল্লিশ মিনিটে জন্ম। এ মেয়ের জীবন আলোয় আলোয় ভরে উঠবে”

কবে, কে জানে?

বিশ্বনাথ কী এখনও ঘুমিয়ে আছে? ঘরে ঢুকে দেখল, বিশ্বনাথ আগের মতোই শুয়ে আছে। হাত দিয়ে গা টা নাড়াতেই ছ্যক করে উঠল বুকটা। আলতো করে ধাক্কা মারতে বিশ্বনাথের হাতটা এলিয়ে পড়ল। ভয় কেঁপে উঠল বুকটা। এবার বেশ জোরে ঝাঁকানি দিল। দেহটা অসহায়ের মতো নিথর। এবার রীতিমতো ভয় করছে নন্দিনীর। নাকের কাছে হাতটা নিয়ে অনুভব করার চেষ্টা করল। কোনো শ্বাসের চিহ্ন নেই! পালসও নেই!

ছুটে রিসেপশনে ফোন “কাম ইমিডিয়েটলি। ইমার্জেন্সি। হারি…” 

লোকজন ছুটে এল। ইন-হাউস ডাক্তার ছুটে এল। অ্যাম্বুলেন্স এল। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল কার্ডিয়াক ম্যাসেজ দিতে দিতে। প্রাণহীন দেহটা ততক্ষণে বিশ্বনাথ ধামে পৌঁছে গেছে। 

নন্দিনী একা ঘরে ফিরে এল। ঠিক কী করবে বুঝতে পারছে না। পরিচয়টা গোপন করবে? না, মানবিকতার খাতিরে সামনে দাঁড়িয়ে মোকাবিলা করবে? ৪৪৪ নম্বর কামরায় ব্যাগটা প্যাক করতে করতে ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। মৃতদের নিয়ে ভাবতে গেলে এগোনো যায় না। কিন্তু তাকে তো চলতে হবে। 

অনেক… অনেক… অনেক দূর!

বিশ্বনাথ চলে গেলেও তো পড়ে আছে তার কয়েকশো পার্মানেন্ট ক্লায়েন্ট। 

কৃষ্ণপক্ষ হলেও শুক্লপক্ষের রাগ গাইতে হবে। সে যে রোহিণী নক্ষত্রের জাতক। ঘন মেঘের মধ্যেও চাঁদের হাসি ফোটাতে হবে।

৬৬৬ অথবা ৪৪৪ – সময় কি ঘর যাই হোক না কেন। 

সে তো যে সে লোক নয়। রাজার দুলালী নন্দিনী। কামধেনু আর বশিষ্ঠের কন্যা। ঈশ্বরের আশীর্বাদধন্যা। আনন্দের প্রতিমূর্তি। তা ছড়ানোর মধ্যেই তার দ্যুতি। তার প্রস্তুতি আবার নতুন করে শুরু করে দিল রাজনন্দিনী নন্দিনী।

ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে একটা ছোট্ট চামড়ার ব্যাগ করল। ছোট্ট, কিন্তু একটা কম্বিনেশন লক দেওয়া। উপরে লেদার ফিনিশ থাকলেও ভিতরে সূক্ষ্ম স্টিলের জাল দেওয়া ব্যাগটা সহজে কেউ কাটতে পারবে না। তারপর কম্বিনেশন ঘুরিয়ে ব্যাগটা খুলে একটা ছোট্ট মোটোরোলা সেল ফোন বার করল। এটা বিশেষ ফোন। মেরেকেটে দশটা নাম্বার আছে কি না সন্দেহ। অত্যন্ত প্রয়োজন ছাড়া এ নাম্বারগুলোতে কল করা যায় না। আগে তার কখনো দরকার হয়নি। কিন্তু আজ সে নিরুপায়। আজ বাঁচতে হলে কল করতেই হবে এই নাম্বারগুলোর আড়ালে লুকিয়ে থাকা, মুখহীন কায়াহীন মুস্কিল আসানদের। কোনটা কার নাম্বার, তার কোনো ধারণাই নেই। দরকারও নেই। 

সে র‍্যানডামলি একটা নাম্বারে ডায়াল করল। ওপাশে রিং হচ্ছে – একটা অত্যন্ত জনপ্রিয় হিন্দি গানের মিউজিক বাজছে। তারপর একজন সুকণ্ঠী মহিলার গলায় ভেসে এল “রিল্যাক্স। জাস্ট টেল মি ইওর প্রবলেম ডিয়ার” …

চিত্রশিল্পীঃ অদিতি চক্রবর্তী

ক্রস রোড

Create a free website or blog at WordPress.com.

Up ↑

StormyPetrel

আমার মনের মাঝে যে গান বাজে,শুনতে কি পাও গো?

Writcrit

Creative and Bookish

The Blabbermouth

Sharing life stories, as it is.

Prescription For Murder

MURDER...MAYHEM...MEDICINE

Journeyman

Travel With Me

কবিতার খাতা

কবিতার ভুবনে স্বাগতম

NEW MEDIA

LITERARY PAGE

Coalemus's Column

All about life, the universe and everything!

Ronmamita's Blog

Creatively Express Freedom

যশোধরা রায়চৌধুরীর পাতা

তাকে ভালবাসি বলে ভাবতাম/ ভাবা যখনই বন্ধ করেছি/দেখি খুলে ছড়িয়েছে বান্ডিল/যত খয়েরি রঙের অপলাপ/আর মেটে লাল রঙা দোষারোপ

Kolkata Film Direction

Movie making is a joyful art for me. I enjoy it as hobbyist filmmaker - Robin Das

arindam67

বাংলা ট্রাভেলগ

The Postnational Monitor

Confucianist Nations and Sub-Sahara African Focused Affairs Site

TIME

Current & Breaking News | National & World Updates

বিন্দুবিসর্গ bindubisarga

An unputdownable Political Thriller in Bengali by Debotosh Das

rajaguhablog

Welcome to your new home on WordPress.com

জীবনানন্দ দাশের কবিতা

অন্ধকারে জলের কোলাহল

Debraj Moulick

Dangling between Books & Films

A Bong পেটুক's quest .....

“I hate people who are not serious about meals. It is so shallow of them.” ― Oscar Wilde, The Importance of Being Earnest

%d bloggers like this: