Tomake Front Cover (Low Resolution)

প্রথম প্রকাশের ভূমিকা

অনিরুদ্ধ বসুর “তোমাকে”-র পাণ্ডুলিপিটি পড়ার পর একটা কথাই মনে হল যে, আধুনিক বাংলা সাহিত্য সত্যিই বোধহয় সাবালক হয়ে যাচ্ছে। সাহিত্যের ম্যচুরিটির পরিচয় বলতে একদল লোক বোঝেন অকপট যৌনতা অবাধে বলার অধিকার। আমি সে দলে নই। সাহিত্যের সাবালকত্ব শুধুমাত্র যৌনতার খুল্লামখুল্লা বিবরণেই হয় না। আরও অনেক কিছুই প্রয়োজন সেই তকমাটুকু অর্জন করার জন্য। সবচেয়ে বেশি যেটা লাগে, তা হল সেরিব্রাল ম্যচুরিটি, অর্থাৎ মানসিক সাবালকত্ব। সেটা বোঝা যাবে কী করে? উত্তরটা হল, মানসিক বিস্তৃতি দেখে।

সাহিত্য জীবনের প্রতিচ্ছবি। জীবন বলতে আমরা কী বুঝি, এ প্রশ্ন করলে নানা জন নানা উত্তর দেবেন, কেননা প্রত্যেকেই জীবনকে নিজের প্যারাডাইম দিয়ে দেখেন এবং বিচার করেন। কিন্তু জীবন শুধুমাত্র একজন বা এক দল বা এক জাতির দর্শন নয়। জীবন মানে এর উপরেও অনেক কিছু। প্রকৃতির সঙ্গে ইন্টার‌্যাকশন জীবন। তাই তার মধ্যে এমন অনেক কিছু ঢুকে পড়ে, যা হয়তো-বা একজন সাধারণ মানুষের হিসেবের বাইরে। সাহিত্য তখনই সাবালকত্ব অর্জন করে, যখন এই সব অজানা অচেনা দিকগুলো সাহিত্যের মধ্যে প্রকাশিত হয়।

‘তোমাকে’ উপন্যাসটি সেইরকম একটি গণ্ডিভাঙা লেখা। না, চিঠি দিয়ে লেখা বলে নয়, কারণ বাংলা সাহিত্যে পত্রসাহিত্যের অভাব নেই। ‘তোমাকে’-র অনন্যতা অন্যখানে। এর নতুনত্ব হল ভার্টিকাল টাইম (যাকে বাংলায় বলা যেতে পারে ‘উল্লম্ব সময়’)-এর মতো একটা কঠিন ম্যথেমেটিকাল কনসেপ্ট নিয়ে দুজন মানুষের আশা আকাঙক্ষাকে ফুটিয়ে তোলা।

নায়ক এবং নায়িকা, কারও নাম নেই (এটাও একটা নতুন স্টাইল বলা যায়)। নামহীন দুজন মানব-মানবী আধুনিক জীবনের গোলকধাঁধায় কানামাছি খেলছে নিজের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে। প্রেমকে খুঁজতে গিয়ে কামের চোরাবালিতেও পড়েছে। আর তাদের এই খোঁজাটা তাদের পৌঁছে দিচ্ছে সময়ের অন্দরমহলে। এই সেই সময়, যা এক উদাসী সন্ন্যাসীর মতো বয়ে চলেছে কোনো দিকে না তাকিয়ে। কিন্তু হঠাৎ হঠাৎ এই উদাসীর চলার ছন্দেও আসে ছন্দভাঙার খেলা। সময় হয়ে ওঠে উল্লম্ব। আর এই ভার্টেক্সে যে পড়ে, সে-ই আস্বাদন করে এক তূরীয় লোকের অনন্য অভিজ্ঞতা।

অনিরুদ্ধর কৃতিত্ব, সে এই কঠিন কনসেপ্টটিকে আমাদের ধরা ছোঁয়ার নাগালে পৌঁছে দিয়েছে। বাকিটা মননশীল পাঠকের নিজের মোকাবিলা, সময়ের সঙ্গে।

দুর্গাপুর,             আশিস কুমার চট্রোপাধ্যায়

মে, ২০১১

দ্বিতীয় প্রকাশের ভূমিকা

ব্যতিক্রমী উপন্যাস লেখার দুটো দিক আছে। একদিকে যেমন বিদগ্ধ মহলে তা বিশেষ সমাদৃত হয়ে বেস্টসেলার হয়ে যায়, অন্যদিকে কিছু সমালোচকদের হাতে পড়ে অর্থহীন লেখার আখ্যা পায়। পত্র-সাহিত্যের চেনা গতে ফেলে ওরা খুঁজতে চায় চিরায়ত একটি ভ্রমণ কাহিনি ও গতানুগতিক বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে কোনো পরকীয়া প্রেমের বিন্যাস। যেটুকু থাকবে সরল চিন্তার মায়াজালে জড়িয়ে।

পত্র-সাহিত্য হিসেবে লেখা হলেও, ‘তোমাকে…’ যে তার পরিধি ছাড়িয়ে সময়ের অন্দরমহলে পৌঁছে গেছে এবং সময়ের লিনিয়ারিটি ভেদ করে তার চতুর্থ মাত্রা বা ফোর্থ ডাইমেনশন ‘উলম্ব সময়’, যা ‘ভারটিক্যাল টাইম’ তার হাত ধরে পৌঁছে গেছে তূরীয় লোকে। সাধারণ পাঠক এত কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকে যে, সেই কঠিন ধারণা আস্বাদন করতে ব্যর্থ হয়।

আসলে যে যেভাবে দেখে, কিংবা দেখতে চায়, বা দেখতে অভ্যস্ত, এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই আসল। থমকে দাঁড়ানো সংকীর্ণ  ভাবনার অচলায়তনে আজকের দিনে প্রাসঙ্গিক কোনো চিন্তাধারা মেলে ধরাই ছিল লেখাটির মুল উদ্দেশ্য।

প্রথম সংস্করণে সেই ভাবনার যথাযথ প্রকাশ ঘটেনি বলে বহু পাঠকের অভিযোগ ছিল। সেই বক্তব্যকে শ্রদ্ধা জানিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি বিষয়টিকে সহজভাবে তুলে ধরার। এরপর পুরোটাই পাঠকের হাতে ছেড়ে দিলাম।

এই কাহিনিতে যৌথ সম্পর্কের জটিলতা প্রধান আলোচ্য বিষয়। যে চিরন্তন সম্পর্ক চেনা গতে মিশে গেছে কাল্পনিক সময়ে। যেখানে ‘সময়’ বাধাহীন, অনন্ত বলে আমাদের কাছে পরিচিত। মানুষের মনে সত্য-মিথ্যা, ঠিক-ভুল, সম্ভব-অসম্ভব, জানা-অজানা, বোঝা ও না-বোঝার চিরকালীন দ্বন্দ্বর প্রতিফলন।

ব্যবহারিক জীবনে নানা সমস্যা আমরা এতটাই নিজের মতো করে পেয়ে থাকি যে, তাদের সঠিক রূপ আমাদের কাছে বহু সময়ে ভীষণভাবে অস্পষ্ট হয়ে যায়। অত্যন্ত প্রয়োজনেও আমরা না-পারি জানতে, না-পারি তার থেকে বেরিয়ে আসতে। ঘুরপাক খেতে থাকি গতিহীন মননে সময়ের আবর্তে। এবং তখনই নিজেকে আবার তৈরি করতে হয়, মনকে গড়ে তুলতে হয় চিরন্তন মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। সেই মুক্তি যতই তাৎক্ষণিক হোক না কেন, আমাদের চাহিদার কাছে সেটুকু অত্যন্ত জরুরি।

দিনের শেষে বা বলা ভালো সারাদিন, প্রত্যেকের নিজের জন্য একটু স্পেস খুব দরকার। যেখানে এসে প্রতিটা ব্যক্তিত্ব নিজের সামনে দাঁড়ায়, নিজেকে ঝালিয়ে নেয় বা কার্যক্রম তলিয়ে দেখে। সেটুকুর জন্যই বোধহয় প্রতিটা মানুষের কিছুটা নীরবতাও প্রয়োজন। নৈঃশব্দ্য আমাদের অনেকটা ইন্ধন জোগায়।

সমতল থেকে পাহাড় হয়ে আবার সমতলে ফেরা। শেষ পর্যন্ত না পড়লে লেখাটির কেন্দ্রবিন্দুতে কতটা পৌঁছনো যাবে তা নিয়ে সন্দেহ থাকেই। সময়ের ব্যাপ্তিতে লেখাটির স্থান কোথায়, সময়-ই বলে দেবে। লেখক হিসেবে চেষ্টা করেছি গতিশীল বাংলা সাহিত্যকে, একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। আজ পুনঃপ্রকাশনার প্রাক্কালে এক বন্ধুর একটি কবিতার লাইন মনে পড়ে গেল –

‘লেখা তুমি আত্মদহনে জ্বল,

যদি নতুন সুরে, নতুন তানে,

না কিছু বলিতে পার’

শুভেচ্ছা সহ –

এপ্রিল ২০১৫                             অনিরুদ্ধ বসু

কলকাতা

Advertisements