চক্র শুধুমাত্র একটি ডিটেকটিভ উপন্যাস বা ক্রাইম থ্রিলার নয়, সাকুল্যে ৩৮৩ পৃষ্ঠার বইখানি পড়ার পর মনে হয়েছে – এর অন্তর্নিহিত রহস্য অনেক গভীরে, যে পাঠককে বস্তু সত্যের বাইরে ভাবসত্য ও অন্তর সত্যের খোঁজে সর্বার্থে অন্বেষু করে তোলে। লেখকের ইংরেজি-বাংলায় রচিত প্রায় সবগুলি বই পড়ার পর এই উপলব্ধি হয়েছে, পেষায় তিনি বিখ্যাত শল্য চিকিৎসক হয়েও সাহিত্য, বিজ্ঞান, দর্শন, সমাজতত্ত্ব – সব বিষয়েই তিনি সুবিধিত ও মননশীল এবং মানব অস্তিত্বের মূল রহস্য সন্ধানে চির-অন্বেষু রয়েছেন। মানুষ মূলত অত্যন্ত স্বার্থপর, চূড়ান্ত ভোগপ্রিয়, দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষার জগতে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারী। আত্মপ্রতিষ্ঠার অলিন্দে অলিন্দে ভোগবাদী মানুষের নিঃশব্দ বিচরণ। সে সব সময় উচ্চাঙ্খার বশবর্তী হয়ে ভাবে – কী ভাবে, কী উপায়ে কোন পথ অবলম্বন করে সে তার কামনা বাসনার পরিতৃপ্তি ঘটাবে। লেখক এই ভোগ বৃত্তের গহনে মানুষকে নিমজ্জিত হতে দেখে, সমগ্র মানব সমাজের মনে যে প্রশ্নটির জন্ম দিয়েছেন, তা হল – এর বাইরে তবে কী কিছুই নেই?  মানব সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত, ব্যক্তি মানুষ নিরন্তর খোঁজ করতে গিয়ে কি এমন পেয়েছে , যার সমষ্টি রূপ, মানব সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে? তা কি শুধুমাত্র বিজ্ঞান, ধর্ম অথবা এখনও অনাবিষ্কৃত কোনও মৌলিক সত্ত্বা যা অনিবার্য ভাবে মানুষকে সতত অন্বেষু রাখে। মানব সম্পর্কের মূল কাঠামোটি সুনির্দিষ্ট ভাবে তবে কি কখনোই গড়ে উঠবে না, যেখানে মানুষ তাঁর স্বপ্রকাশের রূপটিতে ভালোবাসা, করুণা, মৈত্রী ও সেবার ভেতর দিয়ে ফুটে উঠবে, যা তাঁর চৈতন্যর আঁধার, যা অর্থহীন নয়, লোকোত্তর নয়, তথাকথিত ঈশ্বর সমন্বয় নয়; তা সম্পূর্ণ রূপে বাস্তব সত্য- যা যে কোনও অবস্থাতেই অপ্রতুল নয় বরং অপর্যাপ্ত – কখনো নিঃশেষিত হয় না দানে, যার কণামাত্র গ্রহণ করতে পারলে, মানুষ পরশমণির মতো নিজেকে জ্যোতির্ময় করে তুলতে পারে; যার একটু ছোঁয়ায় সে আলোক সামান্য হয়ে উঠতে পারে।

লেখক এই উপন্যাসের বুনে সূক্ষ্মভাবে যে বোধ জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন, তা হল নিজেকে বাঁচানোর জন্য ও অন্যকে বাঁচাবার ভিন্ন পথ-ও আছে। সে পথের দিশা আমাদের পূর্বপুরুষ দিয়ে গেছেন। আজকের মানুষ, কামনা-বাসনা পরিতৃপ্তির বিশ্বতর ক্ষেত্র রচনা করে তনুসাংসে অঢেল উন্মাদ; সে অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে; আলোয় আলোয় মজে পতঙ্গ প্রথায় পুড়ে মরছে। এই উপন্যাসে লেখক এই বাস্তব সত্যটি চরম মুনশিয়ানার সঙ্গে নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন, ‘বুলহিট’ প্রয়োগ কৌশল আরোপ করে চরিত্রগুলি সহজভাবে উপস্থাপিত করেছেন। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন এক গুচ্ছ চরিত্র যারা অন্তর্গত অস্তিত্বের গহনে গড়ে তুলেছে রহস্যাবৃত বুনোট। এর মধ্যে লেখক এমন একটি মৌল চিন্তার উদ্ভব ঘটিয়েছেন, যা নতুন চিন্তাধারার কেন্দ্রবিন্দু।

এরই মধ্যে প্রত্যেকটি চরিত্র তাদের নিজ গুণে বলিয়ান। সে ভওয়ানিশঙ্কর ভণ্ড সাধুই হোক, ডাক্তার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলিস মধুসূদন, স্নেহাশিস, পরিতোষ সেন, রোশন, দিলওয়ান সিং, রিপোর্টার কাভিয়াঞ্জলি, ঐত্রেয়ি, অতিন কিংবা মডেল শিরিন বা ব্যাবসায়ি ইন্দ্রাক্ষ্মি, শো-বিজ দুনিয়ার কাণ্ডারি চতুর্বেদী, বা আন্ডারওয়ার্ল্ডের ‘ধামাকা’ কাম্বলে। প্রত্যেকটা চরিত্রই নিজস্বতায় মাকড়সার মতো এই চক্রের জাল বুনেছে।

অতি বিস্ময়ের বিষয় হল, লেখক এমন একটি মৌল চিন্তার উদ্ভব ঘটিয়েছেন, যা এই উপন্যাসকে দর্শনের নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। শুধু নৈতিকতার ভিতটাই লেখক নাড়ীয়ে দিয়ে যায়নি, নীতিবাদীদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে মানুষ এখনও কত আদিম, নৃশংস ও বিবেকহীন। লেখার মধ্যে বিশদভাবে ব্যাখ্যা পেয়েছে সিজয়েড পারসন্যালিটি ডিসঅর্ডার – অবসেসিভ, কম্পালসিভ পারসন্যালিটি, টাইপ-আর, এ রেসিলিয়েন্ট ভ্যারাইটি। যা শেষ পর্যন্ত সাব্লিমেশনের আকারে রূপায়িত হয়েছে। যার পরিণতি লেখকের ভাষায় ‘দিস লেড টু অ্যাচিভমেন্টস মেটিরিয়ালি, অ্যান্ড অ্যাট এ লেটার স্টেজ টু এ নন-মেটিরিয়ালিস্টিক আপ্লিফটমেণ্ট’। এই কাহিনিতে লেখক ডাঃ অনঙ্গ দত্তর মুখ দিয়ে রোগের মূল কারণগুলি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে চক্রের পরিধি বিস্তৃত। চরমতম দৈহিক লালসা চরিতার্থ করতে এক শ্রেণীর শঠ, ভণ্ড, প্রতারক, সাধুবেশী শয়তান, সমাজ জীবনকে যৌনতার দিকে ঠেলে দিয়ে সুকুমার মতি সহজ সরল নিষ্পাপ জীবনগুলোকে অকালে ঝরিয়ে দিচ্ছে। তারা যৌনতার আবাহ ও পরিমণ্ডল তৈরি করে সারা ভারতবর্ষ জুড়ে যৌন ব্যাবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এই করে জড়িয়ে পড়েছে অতি উচ্চ-শিক্ষিত ছেলে মেয়েরা যারা নিম্ন-মধ্য-উচ্চবিত্ত থেকে আত্মপ্রতিষ্ঠার তাগিদে ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। এই জীবনকে বেছে নিতে এরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, রাজনীতিবিদ, পুলিস অফিসার, সাংবাদিক, কে নেই এই চক্রের গভীরে!

এই উপন্যাসে, নতুন দর্শনের প্রতিষ্ঠাতার পরিপ্রেক্ষিতে লেখক কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেনঃ সক্রেটিস, জরাথ্রুস্ট, যীশু, গৌতম বুদ্ধ, গ্যালিলিও, জওয়ান অফ আর্ক, রঞ্জিত সিং, চার্লস ডারউইন…  স্বপ্নের রুপায়নেই স্রস্টার সার্থকতা। কিন্তু স্বপ্নের গভীরে বহু প্রশ্ন জেগে ওঠে, পরিক্ষিত সত্যের ভেতর দিয়ে, যতক্ষণ না তা বাস্তব ক্ষেত্রে ফলিত হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে লেখক অতীতকে বীক্ষণ করেছেন, যে অতীত কোনও ভাবেই নিরঙ্কুশ, নিঃশঙ্ক ছিল না।

নতুন কখনোই সম্পূর্ণভাবে নতুন নয়। তাঁর একটা পরম্পরা থেকেই যায়।

ইতিহাস বলে শান্তির পথ কখনো মানুষকে সুস্থিতি দেয়নি, সংগ্রামের পথ-ই মানুষের সৃষ্টির পথ। মহামানবের আবির্ভাব ঘটলে তাকে বলতেই হবে  – এই সুন্দর পৃথিবীকে ভালবেসে আমি নিজেকে ভালবাসতে শিখেছি। বালজেভ বলেছিল অন্যভাবে একই ভাবনায় উদ্দীপিত হয়ে ‘The world belongs to me because I understand it’। আমাদের পূর্বপুরুষ ‘আমি কে?’ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছিলেন। উত্তর পাবার পূর্বে আরও একটি প্রশ্ন উঠে এসেছিল অন্তর থেকে ‘নিজেকে জানো’। মানুষ নিজেকেই জানে না। যখন জানল তখন বলে উঠল ‘আমি অমৃতের পুত্র, আমার ক্ষয় নেই। আমি অক্ষয় অজর অমর। আমি অসৎ থেকে সৎ-এ, অন্ধকার থেকে আলোয়, মৃত্যু থেকে অমৃতের দিকে চির-ধাবমান, চির পথিক আমি’। এই বিশ্ব-বিবেকবাণীর ফলিত রূপ এখনও মানুষের অধরা থেকে গেছে। যা বাস্তব সত্য, যা মানুষ নিজেকে নিজের মতো করেই খুঁজে চলেছে; বহুমাত্রিক তাঁর চিন্তার ও মননের জগৎ যা একের সঙ্গে অন্যের মেলে না। যুগ প্রতিনিধিত্বের এই মনগড়া আত্মবোধ কণ্ঠে যুগবাণীর যে জোগান দেয় তা একটি বিশেষ যুগেরই উচ্চারণ। তা অবিনাশী হতে পারে যদি তাঁর ফলিত রূপ যুগ যুগান্তরের পরিবহনটা পায় পরম্পরার ভেতর দিয়ে। বাস্তবত, সেই বার্তাবাহীদের কণ্টস্বর ক্ষীণ হয়ে আসে যুগের বিবর্তনে। এ এক অমোঘ সত্য এবং এটাই চিরন্তন সত্যও। কী বিজ্ঞানের দিকে, কী দর্শনের দিকে বা ধর্মের মানুষের বিশ্বাস আটুট থাকে না। যুগে যুগে মানুষ তাঁর প্রাণ প্রতিমাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে সাজিয়ে নিতে চায়। নিজেকে জানতে গেলে, যে আত্মবিচার ও আত্মনগ্নায়নের দরকার, আত্মসমীক্ষণের পথ ধরে সে সেখানে যেতে চায় না।

প্লেটো তাঁর আকাদেমিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে এই নগ্নায়ন ঘটিয়েছিলেন। তাঁর রিপাবলিকে ক্ষীণজীবী দুর্বল রোগগ্রস্তের বাঁচার অধিকার ছিল না। প্রতিষ্ঠান যথার্থ শিক্ষার ভেতর দিয়ে সভ্যতার নব নব উন্মেষ ঘটায় যুগের চাহিদাকে পূর্ণতা দিতে এবং ব্যক্তি তাঁর প্রাণ প্রতিষ্ঠানের স্বরূপ সন্ধানী হয়। যে প্রাণের চাহিদা কামনা-বাসনা দ্বারা নিত্য উপেক্ষিত নিত্যভিক্ষু প্রাণের চাহিদা অপরিসীম বলেই তাকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রশমিত করতে বোধিদীপ প্রজ্জ্বলিত করতে হয়। তাঁর জন্যে, সেই সব উপকরণই চাই, যা যজ্ঞ প্রদীপের মতোই স্থায়ী অনির্বাণ আলো দিতে পারে অন্ধকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে। যারা এই উপকরণ জোগানের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করে তাদের হঠিয়ে দিয়েই অগ্নিহোত্রীকে সমিধ সঞ্চয় অক্ষুণ্ণ রাখতে এগিয়ে যেতে হয়। প্রমিহিউজ মানব কল্যাণের জন্যে এই কজটিই করেছিলেন। সুস্থ সবল সুশিক্ষিত বোধদীপ্ত মানুষ সুখকর সুন্দর জীবনের দিশা পায় যখন তার অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণ ঘটে। ফ্রয়েড এই সুন্দর সুস্থ জীবনের সমাধান করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত পাগল হয়ে গেছিলেন।

কারণ মানুষ বড় কঠিন। তাঁর বাস্তব্জিবন সর্বতোভাবে বিয়োগান্ত, আকর্ষণীয় তো নয়ই বরং রুক্ষ নৃশংস। এই নিষ্ঠুর নির্মম বাস্তব শেষ পর্যন্ত তাকে অলৌকিকের চরণে প্রণীত হতে বাধ্য করে, যদিও তা কোনও শান্তির পথ নয়; স্বকল্পিত একটা আশ্রয়বোধ নিরাশ্রয়ই সংশয়ী একা মানুষকে সাময়িক ভাবে শান্তি দেয় মাত্র, তাকে সীমাহীন সহিষ্ণু ও ঘাত সহকরে তোলে মাত্র। নর ও নারী একে অপরের পরিপূরক – কেউ ছোট নয়, কেউ বড় নয়। সৌযম্যের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়েই পরস্পরের জন্য সৃষ্ট। তাদের মধ্যে আসামান্য বলে কিছু নেই। অথচ বাস্তব তা স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু অসাম্যবোধ জেগে ওঠে যখন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রতিটি মানুষ এক একটি একক মাত্র। স্বাধীনতা ও আত্মবোধের জাগরণে মানুষ বিচ্ছিন্ন হতে চায় জৈবিক নিয়মেই। মানুষে মানুষে যখন বিনির্মাণ ঘটতে থাকে তখন এই ভিন্নতর প্রক্রিয়া ত্বারান্বিত হয়। যৌনতা তখন আর স্বচ্ছাচার নয়, তা একটি স্বভাবিক ঘটনা মাত্র। সুন্দর-অসুন্দর তখন আপেক্ষিক ‘Beauty is in the eye of the beholder’।  দেহবোধ তখন স্বীকৃত প্রাকৃতিক প্রকাশ। সুদীপ্ত ব্যাক্তি ও নিজের মতো করে জাগ্রত করতে পারে। নির্দিষ্ট স্ত্রীগুণ, গতিবন্ত সুশিক্ষিত কখনো পরিগ্রহণ করতে পারে না ; সমদর্শী সমাজ নারী ও পুরুষকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করতে শেখায় না। সক্রেটিস বাবা মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রটি সুনির্দিষ্ট করতে চেয়েছিলেন। সুস্থ ও বলিষ্ঠ নাগরিক জীবন গড়ে তুলতে সন্তানকে সুনির্দিষ্টভাবে কোনও বাবা মায়ের নিজের ঔরসজাত গর্ভস্থ বলে চিহ্নিত করা যাবে না কারণ তা ব্যক্তিকে স্বার্থপর করে তুলবে। এই সাম্য কী সংঘাতিক বিধ্বংসী অস্থিরতা দয়েকে আনেনি? বীর্যবান যোদ্ধৃত্বের সৃজন ও ব্যাপ্তি সমাজকে গতিদান করে যেমন, সূক্ষ্ম অনুভূতির চর্চা অপর দিকে সৃষ্টিকে দান করে অহিংসা ও সমদর্শী হওয়ার বীজমন্ত্র। এখনে বিজ্ঞানীর সঙ্গে দার্শনিকের চিন্তন ক্ষেত্র মেরু-ব্যবধান পরিলক্ষিত হয়। একটি ছেলের সঙ্গে একটি মেয়ের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি পরিক্ষিত জীবনের ভেতর দিয়েই তারাই করে নিতে চায়। আরোপিত কিছু নীতিবোধের বিজ বপন করে তাদের আত্মবোধকে আহত করার অধিকার তাই তাড়া মেনে নেয় না।

এ যুগের ছেলে মেয়েরা তাই ফ্রইয়েড ও ডি এইচ লরেন্সেদের পুরনো টুপির সঙ্গে তুলনা করে। এ যুগের নারী-পুরুষ প্রথগত বিবাহ সম্পর্কে না এসে স্বামী স্ত্রীর মতো সারাজীবন কাটাতে পারে। অ্যানা কারেনিনা  ও ম্যডাস বভারিকে ব্যভিচারী আখ্যায় ভূষিত করা হলেও, তাড়া আজকের সমাজে অসম্মানিত নন। যুগ যত বদলাচ্ছে, বিচ্ছিন্নতা তত বাড়ছে। মনুষ্যত্বের সংজ্ঞা নতুন করে নির্মিত হচ্ছে। এক একটি মানুষ এখন নিজেকে সামাজিক একক ভাবতে বিব্রতবোধ করে না। এই বোধের জন্ম হয়েছে মরুভূমির চোরাবালির কর্ম-নিঃসরণ-অবস্থান্তরের মতো বাস্তবক্ষেত্রে নিজের অবস্থানকে একই অবস্থায় দেখতে শিখে। প্রাচ্যের ‘যদিদং হৃদয়ং তব তদন্তু হৃদয়ং মম’ বলার দিন অতিক্রান্ত। এখনও কোনও তরুণ বা তরুণী – ‘আমি তোমাকে ভালবাসি’ বাক্যটি উচ্চারণ করতে কুণ্ঠিত, কারণ ভালবাসার দায় নিতে সেও প্রস্তুত নয়, মনে প্রাণে। দার্শনিক কান্ট লাস্যসিক্ত কোনও প্রকাশকে মরালীটির অন্তর্ভুক্ত করেননি। এখন বহু বছরের বন্ধুত্ব একটি মাত্র হ্যাণদসেক দিয়ে শেষ করে দেওয়া যায়।

যৌনতার প্রকাশও একইভাবে চিহ্নিত, কারণ কোনও এক বিশেষ সম্পর্কের গভীরে নিজেকে খুঁজতে গিয়ে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্লেটো তাই সম্পর্কের স্থায়িত্ব স্বীকার করেননি। আজকের নারী অতীতের নারীর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে অপারগ। কারণ সেদিন এদিনে বিশ্বতর ব্যবধান ঘটে গেছে। আর এই ব্যবধানই গতির জীবনকে গড়ে তুলে মানুষকে নূতন নূতন দিশা দান করে। বিবাহ প্রজাপতির বন্ধন নয়, কারণ আজকের জগতে প্রজাপতির মৃত্যু ঘটিয়েছে মানুষ। ভালোমন্দ এখন মানুষের মূল্যবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। ভগবানের মৃত্যু ঘটে গেছে বলে এখন সবই স্বীকৃত। তাই সক্রেটিসের পরিক্ষিত জীবন এখন কল্পনা মাত্র। মহামতি নীৎসে ঈশ্বর ভাবনার জগতে সুনামি ঘটিয়ে দিয়েছেন। তখন আর কিছুই পরম্পরা নির্দেশিত নয়; প্রাচীন মূল্যবোধ দ্বারাও নিয়ন্ত্রিত নয়। ফ্রয়েড মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ বিষয় অত্যন্ত চিন্তিত ছিলেন শুধু নয়, সন্দিগ্ধ ছিলেন । অন্যদিকে ওয়েবার অনেক বেশি মননশীল ছিলেন বিজ্ঞান, নৈতিকতা ও রাজনীতি বিষয়ে। তিনি নিজেকে স্থায়ী বিয়োগান্ত জীবনে একজন অস্থায়ী অস্তিত্বমাত্র মনে করতেন। তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন, একটা অস্থিরতা অনিশ্চয়তা মানুষকে অহরহ মানুষকে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে। এবং মূল্যবোধ এই সবের বহু ঊর্ধ্বে অধরাই থেকে গেছে। বিজ্ঞান তাকে নাগালের মধ্যে এনে দিতে অপারগ। অঙ্ক কষে নির্দিষ্ট পরিচালনা শক্তির নির্ভুল প্রয়োগ করেও বিচ্ছিন্নতা থেকে মুক্ত করা যাচ্ছে না। এখানে যুক্তিশক্তিহীন মানুষ এখন যে জীবনের অঙ্গনে প্রবেশ করেছে তা নিন্দিত, অনিন্দিত, যাই হোক সে যুগস্বর হয়ে বিশ্বকে মাতিয়ে তুলেছে। তাঁর ভেতর যে বিপ্লব ঘটে চলেছে, তাঁর মূলে অবস্থান করছে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উৎপাদন জনিত অভাবনীয় সমৃদ্ধি। এখন আর ১৬৮৮ ইংল্যান্ডের গ্লরিয়ান রেভলিউশন বা ফরাসি বিপ্লবের মতো অবস্থার আবির্ভাব ঘটবে না কারণ মানুষের ভেতরে বিপুল বিবর্তন ঘটে চলেছে অহরহ। এখন লেফট রাইটের দ্বন্দ্ব প্রকট হতে পারবে না। এখন মানুষ যতটা নিখুঁতভাবে বিচক্ষন ধুরন্ধর কৌশলী হতে পারবে ততই তাঁর মঙ্গল। তাঁর জন্য নৈতিকতা রক্ষা এখন কোনও অবশ শর্ত নয়। টিকি টুপি ত্রিশূল চার্চের ঘণ্টাধ্বনির এখন বিশেষ তাৎপর্য নেই।

সক্রেটিষের কল্পনায় ছিল সর্বদা উজ্জ্বল আলোকিত শহরজীবন, যেখানে নাগরিকের অন্তরে ছিল সুন্দর ও সত্যের নিত্য অবস্থান। অন্যদিকে হবস অনুভব করেছিলেন মানুষ একান্তই একা এবং তাঁর জীবন ছিল নিত্য বিধ্বস্ত ঘৃণ্য নিচ ও নৃশংস। হবস, লক, রুশো উপলব্ধি করেছিলেন যে কারণেই হোক প্রকৃতিই মানুষকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। মানুষের এই অবস্থানের ভগবান নেই, ভগবানের করুণা নেই, অনুকম্পা নেই। মানুষ নিজের চেষ্টাতেই এগিয়েছে এবং নিজের বর্তমান ভবিষ্যৎ ব্যাপারে নিজেই ভাবতে শিখেছে। মানুষ নিজেই অভূতপূর্ব সত্ত্বা।

প্রশ্ন হল, সেই সত্ত্বাটি কী মনস্তত্ত্বই মানুষকে এই প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে? যদি এটাই মেনে নিতে হয় তবে তো প্যান্ডেরার বাক্সটি খুলে যায়। সেক্সপিয়ার রচিত চরিত্র ইয়াগোর মতোই বলে উঠবে ‘I never found men who knew how to love himself’। আজকের মনস্তত্ত্ব যার জন্মদাতা। মেকিয়াভেলি, মানুষকে প্রচোদিত করে এই বাস্তব সত্যেই স্থির হতে চায় যে, নিজেকে জানতে মানুষ স্বার্থপর হবেই। তাঁর ‘সেলফ’ বা স্বয়ংকে খুব গভীরভাবে জানতে হবে, নিজের কল্যাণের জন্যেই, যে স্বয়ং বা সেলফ বা স্বয়ংবোধ অত্যাধুনিক এক বোধ যা আত্মার সমার্থবোধক এক নবীন আবির্ভাব বলা যায়। তাঁর উৎকর্ষের পরিধি অসামান্য, যা মানুষকে, নিয়ত সৃজনশীল রাখে।

শিল্পের জন্য স্বাধীনতা চাই-ই চাই। এক্ষেত্রে মানুষ যুক্তিতে চলে না, প্রশ্নাতীত এক অনুভবের আন্দোলনে শিল্পী নিজের মনের বিস্তার ঘটিয়ে চলে। যেখানে কোনও বিজ্ঞানবোধ কাজ করে না। হোমার, দান্তে, রাফেল, বিঠফেন, সেই শিল্পী সত্ত্বার বারক ও বাহক। তারা তাদের যুগ অতিক্রম করে গেছেন। এখন পুরনো কোনও কিছুর আলোকে নতুনকে দেখা যাবে না। এখন যে কালচারের বিপুল পরিবর্তন ঘটে গেছে, সেখানে মানুষ তার প্রাধ্যানেই চিহ্নিত হবে এবং এই বিশেষত্বই তাকে বাঁচিয়ে রাখবে।  মানুষের মনুষ্যত্ববোধ গড়ে ওঠে যুক্তিযুক্ততা ও কল্যাণবোধের জাগরণের মধ্যে দিয়ে। ধর্ম যদি থাকে, তবে যুক্তি তার বুনিয়াদ হবে না কোন ভাবেই। ধর্ম বিশ্বাস মাত্র, বিস্ববান বিজ্ঞান বা যুক্তিনির্ভর নয়। কালচারের জন্ম যুক্তি ও ধর্মের সংশ্লেষ থেকে। যা আমরা ভালবাসি, তাই ভালো।

চক্র উপন্যাসের ভিত, একদিন জেগে ওঠা মোজেস, যীশু, হোমার, বুদ্ধ প্রমুখ মহামানবদের চেতনার বর্তমান রূপে। এই বিকল্প পথে এগিয়ে যেতে ঝুঁকি আছে। যেমন ভগবানের মৃত্যু ঘটিয়ে মানুষ এক চরম ঝুঁকি নিয়েছে। এই ঝুঁকি নেওয়ার পরও আপসের পথ ধরতে আগ্রহী। এই আপসে যদি শান্তি আসে তবে আপত্তিই বা কোথায়? মানুষ যে অভিজ্ঞতা থেকে সার্বিকভাবে মুক্ত তা-ও কি বলা যাবে? নতুনভাবে বাঁচা কিংবা মরা এক নতুন চেতনা। সক্রেটিসের ভাষায় ‘Learning how to die’।

চক্র অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের পথ খুঁজতে চেয়েছে। উপন্যাসটি সেই অর্থে মানুষের প্রেরণার দিক। যুগ-যন্ত্রণার সব হলাহল কণ্ঠে নিয়ে অমৃতকামী মানুষ, শুভ-অশুভের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে চাইছে। যুক্তির দিক দিয়ে যজ্ঞবেদি রচনায় বিজ্ঞান প্রযুক্তি তাকে কতটা নির্ভরতা দেবে, তা প্রশ্নাতীত না হলেও নতুন চেতনার সংকল্পে মানুষ নতুন করে কিছু পাবে, এ আশা করাই যায়। স্রস্টা যিনি, তিনি সৃজন করেন, পরিগ্রহণের আনন্দ যাদের জন্যে, এই সৃষ্টি তাদের। চক্র বাস্তব জীবন সত্যকে প্রকটিত করে মানুষের এগিয়ে চলার পথকে সুগম করতে চেয়েছে। যুক্তি তর্ক বিশ্বাস অবিশ্বাসের বেড়াজাল থেকে, মানুষের উত্তরণের পথে অধরা বলেই চক্রের চক্রায়ন চলতেই থাকবে। অপর দিকে তার থেকে মুক্তি পাবার সাধনা একই সঙ্গে চলতে থাকবে।

গ্রন্থটি পড়তে শুরু করলে শেষ না হওয়া অবধি পাঠক কী হতে চলেছে, এর পর কী হবে – এই চিন্তায় মজে থাকে। সাবলীল ভাষা সম্পদে ঋদ্ধ গ্রন্থটি। যৌনতার বিবরণ পরিশীলিত মনকে বিব্রত করে কখনো কখনো। ইংরেজি ভাষায় সড়গড় না হলে এই বইয়ের মর্মোদ্ধার করা অসম্ভব মনে হয়।

http://www.anibose.com/bookdetail/Chakra/3/

Advertisements