“মা আমাদের পূর্ণ উচ্চারণ, প্রথম পুণ্য অনুভব

মাগো যেদিকে চাই, সেদিকে রয়েছ তুমি

তুমি শুভ প্রতীক, জীবনবোধের অবারিত বাসভূমি

তুমি ভোরের আলোয় ভরা পবিত্রতার চেনা মুখ

স্নিগ্ধ, শান্ত, প্রসন্নতার চিরসুখ

ভবনে থেকেও তুমি ভুবনগামী

মাগো যেদিকে চাই, সেদিকে রয়েছ তুমি

একটু চোখের আড়াল হলে অভিমানে বহুদূর

ক্ষমায় আপন তুমি মোহন বাঁশির মিঠে সুর

অন্তরে থেকে তুমি অন্তর্যামী

মাগো, যেদিকে চাই, সেদিকে রয়েছ তুমি”

এক অজানা সর্বশক্তিমানকে যুগ যুগ ধরে মানুষ কল্পনার চোখে দেখেছে। কারণ পৃথিবী সৃষ্টির আদি অনন্তকাল থেকে পূর্ব পুরুষেরা শিখিয়েছেন ক্ষমতা বাইরেও এমন কোনও শক্তি আছে যে আমাদের জীবনের গতিপথকে নিয়ন্ত্রণ করে। সেই সর্বশক্তিমানকে তাদের সর্বস্ব দিয়ে ভক্তির অর্ঘ দিয়েছে। কখনো বা এই অজানা অচেনা তীব্র শক্তিকে একাকী নিভৃত আঁধারে, কখনো বা কোনও বিগ্রহ রূপে, কখনো বা কোনও মহাপুরুষের বাণীকে পাথেয় করে ধর্মের কাছে সঁপে।

যদিও ধর্ম ইতিহাস সাক্ষী বহু ধর্ম যুদ্ধের, তাকে উপেক্ষা করেই ধর্মের প্রবক্তাদের আনুষ্ঠানিক ভক্তি-শ্রদ্ধা জানিয়েছে। রামচন্দ্রের অকালবোধন ঠাই পেয়েছে শরতের সুপ্রভাতে, ঘরের মেয়ের আরাধনায় – স্বর্গলোক থেকে মর্তলোকে, কল্পনার দেবীকে বড় কাছে পাওয়ার চারটে দিনে। শুধু কাছ থেকে পুজর অর্ঘ নিবেদনে নয়, দেবী ও তার চার পুত্র-কন্যাকে নিজের করে পাওয়া, আনন্দঘেরা উৎসবে। পুজ আসছে। ‘বাজলো তোমার আলোর বেণু’ – ভুবন মেতেছে পুজর উৎসবে। মা কল্পনার মহাবিশ্ব থেকে বাস্তবের মাতৃগৃহে ছুটি কাটাতে আসছেন।

তাই আমাদেরও ছুটি। আনন্দোৎসব। দুর্গোৎসব।

নতুন নতুন থিমে সাজাচ্ছে কাল্পনিক মাতৃত্বকে। কল্পনার দেবীর রূপ ও আঁকার পাল্টেছে, যুগের তালে তাল রেখে। নিজেরাও সাজছে নতুন বেশে, মাকে ইহলোকে বন্দনা করতে। রাগ, ক্লেশ, বিবাদ, দুঃখ ভুলে একসঙ্গে মিলতে, মায়ের আগমনী আসরে। একই ছন্দে, একই তালে, মায়ের বন্দনাগানে।

সর্বশক্তিমান তো অন্তরের শ্রদ্ধার প্রতীক মাত্র। বিগ্রহের পুজর বাইরে তো হাজারও মা লুকিয়ে আছে আমাদের মধ্যে। গৃহবধূ থেকে না-চেনা বধূ। এই মাতৃত্বের রূপ যুগ যুগ ধরে পাল্টেছে। কখনো আটপৌর শাড়ীতে জননী রূপে, কখনো বিবাহের বন্ধনের বাইরে লিভিং টুগেদার সম্পর্কে, কখনো বা গণিতের ‘ভেন ডায়াগ্রাম থিওরি’ আকারে জৈবিক সম্পর্কের ঊর্ধ্বে অন্তরের না-বলা ছন্দের নিঃশব্দ মৌনতায়। এই মৌনতায় মধ্যে অচেনা জীবনের স্পন্দন। যেখানে বাজে না-চেনা রাগ, ঝঙ্কার তোলে না-বলা মাতৃত্বের বোল। সে সুর তো আমাদের মধ্যেই। শুধু তাকে পরখ করাটাই অজানা। নিঃশব্দ মৌনতায়, আপেক্ষিকতার মোহ কাটিয়ে, অন্তরের নিভৃতে। যেখানে অজান্তে, অলক্ষ্যে বেজে চলে লেসারের কম্পন, জা মিসেল জার অজানা নতুন সিম্ফনি।

rozabal_shrineগামী দিনে এই সংজ্ঞার বিবর্তন হবে। বন্ধনের বাইরে মাদার মেরির যিশু খ্রিস্টেকে জন্মের রূপকথা আপ্লুত করবে না আমাদের মূর্খ চেতনাকে। সেদিন আরেক যিশু ইউজ আসফ নাম নিয়ে, কোনও এক রোজাবালে বসে শোনাবে আজিবক, সনাতন ধর্মের মূলকে পাথেয় করে, আকারহীন সত্যের অমৃত কথা, আগামীর দর্শন। নাই বা থাকল নাম, নাই বা দেওয়া হল রূপ। বাহাউল্লার মতো শোনাবে চিরায়িত অমৃত সত্য “কসরৎ মেঁ ওহেদৎ”। সেই তো প্রকৃত আরাধনার প্রতিমূর্তি। যে বিশ্বমানবকে বাঁধতে পারে আকারহীন, ধর্মহীন মানবতার বন্ধনে। যা দেশ, কাল, সভ্যতা ভুলে, মানুষেকে বাঁধবে বিশ্বমানবের কল্যাণে। তাকে বরণ করে বেজে উঠবে নতুন আগমনী শঙ্খ, অন্তরের মিলনযজ্ঞে। আগমনীর বন্দনাগানে।

সন্ধ্যারতির পূজার নৈবেদ্য সেদিন মিলবে না-শোনা অন্তরের ঝংকারে। মায়া-কায়া মিলেমিশে একাকার, মাতৃত্বের না-চেনা সুরের ছন্দে। নতুন আনন্দে। গভীর অন্ধকার থেকে আলোর স্পর্শে। মা তো আরাধ্য বিগ্রহের বাইরে একটা উপলব্ধি, একটা অনুভূতি। মুক্তির পথ। শান্তির পথ। চেতনার উত্তরণ। শূন্যতার মধ্যে পূর্ণতার আবেশ। সেই সময় ফিরে দেখতে হবে নিজেকে।

যতদিন না ক্ষুদ্র ব্যক্তিত্ব মিলেমিশে একাকার হয় মহাবিশ্বের অধিষ্ঠিতে, আগমনী অসম্পূর্ণ। যেখানে অস্তিত্বটা অনাপেক্ষিক। জীবাত্মার সংগে পরমাত্মার অবিচ্ছেদ্য মিলনে পূর্ণতা – একমেবাদ্বিতিয়ম ‘সো অহং’ । সেখানে আলো নেই তবু আলোর বন্যা, যেখানে গন্ধ নেই তবু সুগন্ধের ঝর্না, যেখানে কেউ নেই, তবু যেন কার অমৃতস্পর্শে দেহ মন আনন্দে শিহরিত হয়ে ওঠে প্রতি পলে। যেখানে স্তম্ভিত জাগ্রত মহাবিশ্ব বরণ করে নেয় সত্ত্বা আর আত্মাকে পরম স্নেহে। কানে কানে নিঃশব্দে শোনায় এক গম্ভীর প্রণবধ্বনি শান্তির আলোকে, মহাবিশ্বের পরম সত্যের অমৃত কথাঃ

‘ওঁ প্রত্যাগ্যানন্দং ব্রহ্মপুরুষং প্রণবস্বরূপং

অ-কার উ-কার ম-কার ইতি

ওঁ স্বর্বভূতস্থং একং বই নারায়ণং পরমপুরুষং

অকারণং পরমব্রহ্মং ওঁ

ওমিতি ব্রহ্ম ওমিতি ব্রহ্ম…’

CF BLOCK RESIDENTS ASSOCIATION, SALT LAKE CITY, KOLKATA
agomoni1

agomoni2

agomoni3

Agomoni

Advertisements