সামাজিক বিবর্তনের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সময় হয়েছে আরেকবার এই পরিবর্তনের নগ্ন পর্যালোচনার। বিশেষ করে নব্য লভ্য বাঙলার আধুনিকতাকে। ‘বাঙালি বা বাংলা’ বিষয়ক আধুনিকতা, বর্তমান ভৌগোলিক বাংলার মাত্র দু-আড়াইশো বছরের উপনিবেশ পর্বের অবদান। এই পর্ব একাই মহাভারতের সাপেক্ষে ‘আঠারোশো’।

ইংরেজদের মোসাহেবি করা, কলম পেশা, ‘রায় বাহাদুর’ ‘রায় সাহেব’ পদালঙ্কারে শোভিত মাছ-ভাত খাওয়া বাঙালি, কিছু কাঁচা টাকার বাবুয়ানায় ‘ফরেন’ ঘুরে হঠাত যেন সাহেব হয়ে গেল। সুট, বুট, হ্যাট, এমনকি শুদ্ধ ইংরেজি বানানটুকু না জানলেও চলবে, আদব কায়দায় সাহেবি উসৃঙ্খলতা নিয়ে, ঠাটবাট হাঁকিয়ে চললেই ‘সোশ্যাল এলিট’ হওয়া যাবে। সাহেবরা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়ে গেছে। তার মধ্যে প্রধান চিন্তা কোরও না। স্বতন্ত্র চিন্তার বলিকাঠে নিজেকে মেলে, সামাজিক বিরাগভাজন হয়েও না। ইট ড্রিঙ্ক অ্যান্ড বি মেরি, ফর টুমরো উঁই ডাই। চিন্তা করলে যদি বা আরেকটা বুর্জোয়া ক্লাস তৈরি হয়। দেশ শাসনের পক্ষে সেটা মোটেই শুভ নয়। সাহেবরা চলে গেছে। তাদের বাবুয়ানা আজ আর নেই। কিন্তু উত্তর কলকাতার, সাবেকি পায়রা ওড়ানো বাবুয়ানার রক্ত তো এখনও বিলীন হয়ে যায়নি। পুরো অংশে বর্তমান। সাহেবদের তৈরি করা প্ল্যাটফর্ম যদি পাওয়া যায়, তো সোনায় সোহাগা। নিজেকে কষ্ট করে তো আর কিছু করতে হচ্ছে না। খালি বর্তমান চলমানতার মোড়কে তাকে সাজিয়ে নিতে হবে। বিদেশির ছাঁচে রিয়ালিটি সো আর বিকৃত মানসিকতার সিরিয়াল, তাই বেঁচে থাকার উপকরণ। বাবুয়ানার মজলিসের নতুন রূপ। ইন্টারনেটের দাপট আর মিডিয়ার প্রলাপ তো সেই মন্ত্রেই দীক্ষিত করতে সদা আগ্রহী। অক্ষমতার শিখরে দাঁড়িয়ে, রঙিন স্বপ্নের মখমলে বিছানায় নিজেকে ভাসিয়ে দাও। ওখানেই শান্তি, ওখানেই তৃপ্তি, ওখানেই মুক্তি। মধ্যবিত্ত বাঙালির সাহেবি মোড়কে বিদেশিয়ানা ঘেঁষা স্ট্যাটাসের পূর্ণতা। বাবু কালচারের বর্তমান আভরণ।

বাবু কালচারের বর্তমান রূপ দেখে সংশয় জাগে, এটাই কী বাঙালি কালচার? গরম দেশেও ড্রিঙ্ক না হলে পার্টি জমে না। মোবাইলে গার্ল ফ্রেন্ডের সঙ্গে চ্যাট না করতে পারলে কী মডার্ন হওয়া যায়? মধ্যরাতে ডিস্কও থেকে বয় ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিলাসিতা – নব্য রঙে সেজে ওঠে আধুনিক কালচার। বাবা-মায়ের প্রশ্রয়ে ছেলে-মেয়েরা ঘরের পার্টিতে মদ্যপান করাটা আধুনিক ফ্যাসান। আর সেই বাবা যদি সমাজের কেউকেটা হয়, তাহলে তো এটাই সামাজিক রীতি, নীতি, সংস্কৃতি। ‘সেলিব্রিটির’ ভূষণে শোভিত, কাঁচা টাকার দেমাকে গর্বিত, কিংবা নেটওয়ার্কিং-এ বলিয়ান কৃষ্টি তাই বর্তমান সমাজের নিয়ামক। শাশ্বত সত্যগুলো কেমন জোলো, ম্যানমেনে। থাক না ওগুলো পড়ে ভারতীয় সংস্কৃতির ছেড়া পাতায়। ওসব ঘাঁটলে তো আর সাহেব হওয়া যায় না। তাই আধুনিক হতে গেলে ওসব পড়ে সময় নষ্ট করার মানেই হয় না। সকাল থেকে সন্ধে অবধি, সামাজিক অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে, ইহা-উহা করে দিনশেষে একটু মৌজ না করে, কোন পাগল সাহেবি আভরণ হাঁটিয়ে, ভারতীয় কৃষ্টি-সভ্যতা ঘাঁটতে বসে?

অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে গিয়ে ঠেকে অন্তরের শূন্যতা। যে সামাজিক কাঠামো বর্তমান আধুনিকতার স্তম্ভ, সেটা সরে গেলে তো অস্তিত্ব নিঃস্ব। যেন কঙ্কালের মধ্যে প্রলেপ লাগিয়ে কতগুলো শব ভূষণে, দূষণে, আলোকিত করে রেখেছে এক অন্তঃসারহীন সত্যকে। যা মৃত্যুর চেয়ে বিভীষিকার মতো তাড়িয়ে বেড়ায় একাকী, নির্জনে। তাই নির্জনতা বর্জনীয়। সেই সামাজিক কাঠামোতে যদি আত্মজকে মিথ্য বলতে শেখাতে হয়, যদি আত্মজের পাপে হাত মিলিয়ে সায় দিতে হয়, তাও গ্রহণযোগ্য। একাকীত্বের সত্য থেকে তো পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। সেটা যে আরও বীভৎস, ভয়ঙ্কর।

সেখানে পাপ-পুন্য, ভাল-মন্দ, বলে কিছু নেই। সেখানে আছে এক ক্ষয়িষ্ণু সমাজের ওপর ভেসে বেড়ানর আপ্রাণ প্রয়াস। আধুনিকতার নিঃস্বতার মধ্যে সেটুকুই যেন বেঁচে থাকার একমাত্র পাথেয়। তবুও মাঝরাতে, একা ঘুম ভাঙা অন্ধকারে, কোন গভীর থেকে যখন ভেসে আসে অতৃপ্তির আর্তনাদ, একবারও কী মনে হয় না, আরেকবার নিজেকে দেখার? আধুনিকতার চুড়ায় বসেও নিজের নিঃস্বতা? যদি কখনো মনে হয়, সেদিন কৃষ্টি, সংস্কৃতি আর্তনাদ করবে, কবিগুরুকে বেচবার জন্য নয়, আবার নতুন রূপে পাওয়ার জন্য। মন ডুকরে কেঁদে বলবে ‘দাও ফিরে সেই অরণ্য, লও এ নগর’। সেখানেই আধুনিক সমাজের জৈবিক ব্যর্থতার আসল পরাজয়।

Advertisements