অ্যামেরিকার নারী পত্রিকায় প্রকাশিত মে-জুন ২০১৬  

“মা আমাদের পূর্ণ উচ্চারণ, প্রথম পুণ্য অনুভব। 

মাগো যেদিকে চাই, সেদিকে রয়েছ তুমি। 

তুমি শুভ প্রতীক, জীবনবোধের অবারিত বাসভূমি। 

তুমি ভোরের আলোয় ভরা পবিত্রতার চেনা মুখ। 

স্নিগ্ধ, শান্ত, প্রসন্নতার চিরসুখ। 

ভবনে থেকেও তুমি ভুবনগামী।

মাগো যেদিকে চাই, সেদিকে রয়েছ তুমি। 

একটু চোখের আড়াল হলে অভিমানে বহুদূর।

ক্ষমায় আপন তুমি মোহন বাঁশির মিঠে সুর। 

অন্তরে থেকে তুমি অন্তর্যামী। 

মাগো যেদিকে চাই, সেদিকে রয়েছ তুমি”

পুণ্য অনুভূতির জীবনবোধের উৎস ধাত্রীর ঔরস। বিশ্বব্যাপ্তির চেতনা থেকে অবারিত শান্তির কোলে পাথেয়। সেই মা শব্দটির পরিধি অসীম।

ঔরসের নিশ্চিন্ত বাতাবরণ থেকে ধরিত্রীর প্রথম আলোয় সহায়, তার ছোঁয়া তো কেবল জন্মলগ্ন থেকে নয়। জন্ম দিয়েছিলে আমাকে। স্তন-দুগ্ধ দিয়ে অন্নপ্রাশনের প্রথম অন্ন তুলে, জরা ব্যাধি থেকে আড়াল করেছিলে দুগ্ধের প্রতিরোধক শক্তির অপার মহিমায়। কথা শিখেছিলাম তোমার মিষ্টিমধুর বোলে। হাঁটতে শিখেছিলাম তোমার হাতে, হাত ধরে। প্রস্তুত করেছিলে জীবনযুদ্ধে একা চলতে। ‘মা গো মা এলাম তোমার কোলে, তোমার ছায়ায় তোমার মায়ায় মানুষ হব বলে’ 

মাতৃত্ব তো জীবন গতির নির্ধারিত চিরায়িত প্রবাহ নয়। নানা রূপে, নানা রঙে, নানা চেতনার তার প্রকাশ। জীবনের প্রতি মুহূর্তে। নানা সুর-রং-ছন্দ-অনুভবে তার বিকাশ। অবকাশের মধ্যেও, সান্ত্বনার স্নিগ্ধ শান্ত বাতাস। ‘বাবা বাছার’ বাইরেও বৃহত্তর জীবনে, তার পূর্ণতার প্রতিভাস। নাই বা রইল ‘ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি মোদের বাড়ি এস’ কিংবা ‘আয় আয় চাঁদ মামা খোকার কপালে টিপ দিয়ে যা’ শিশুকালের ঘুম পাড়ানি গান। ভোর হলে জাগাতে নতুন চেতনায় – বিশ্বের মুখোমুখি একা। তবুও পেছন থেকে অদৃশ্য ভরসা “বাছা তোকে তো তৈরি করেছি বিশ্বের মুখোমুখি দাঁড়াবার। পারবি না, আমাকে ছাড়া?”

সেই কবেকার কথা। বহুদিন আগে বেলুড় মঠে সন্ধেটা কাটাতে গেছিলাম। গঙ্গার পাড়ে একা বসে তাকিয়ে ছিলাম দিনান্তে ক্ষীণ হওয়া সূর্যের দিকে। আস্তে আস্তে আকাশের আলো কমে আসছিল। একটা দুটো করে তারা ফুটে উঠছিল আকাশের ক্যানভাসে। গঙ্গার জল ধীরে ধীরে কালচে আকার নিচ্ছে। দূরে দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে একটা নৌকো পাল তুলে ভেসে আসছে। রাতের আঁচলটা আস্তে  আস্তে  হাওয়ায় উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। সন্ধ্যা নামছে, ধীর পায়ে। ক্লান্ত অবসন্নতার শিথিল আচ্ছাদন বিছিয়ে। আকাশের এঘর ওঘর সেঘরের দরজা খুলে, সব ঘরেই একটা একটা করে, মৃদু তারার মোমবাতি জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

মুগ্ধ হয়ে তাকিয়েছিলাম। হঠাৎ মনে হল, এই সন্ধ্যার সঙ্গে মায়ের যেন কোথায় যেন একটা অদ্ভুত মিল। সারাদিন হুটপাটি করে বাচ্চারা ঘরে ফিরেছে। শ্রান্ত ক্লান্ত অসহায়। মা তাদের আসার পথ চেয়ে ঘরে ঘরে দিয়া জ্বালিয়ে বসে। কখন ওরা এসে মায়ের কোলে লুটোপুটি খাবে। সন্ধ্যার আঁধার যেন মায়ের ঘন কালো চুল। মা আর সন্ধ্যা একাকার। দুচোখে হঠাৎই ভীষণ জ্বালা। চোখে জল। গোধূলির শেষ রশ্মি তখন গঙ্গার ওপর বিদায়বেলার শেষ আলোর আভা ছড়িয়ে ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে। রাগ ভূপালির শেষ রেশটা টেনে দিচ্ছে অস্তগামী সূর্যের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া আলোর দিগন্তে। বর্ণহীন অন্ধকার আবার সেজে উঠছে নতুন বর্ণের আভরণে। কালো শাড়িতে ঢাকা ঘোমটা তোলা মা, সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালাতে গিয়ে থমকে গেছে। ওপাশের দাওয়ায় শিশুটির কান্না তুলসীতলার প্রাঙ্গণ থেকে তাকে ফিরিয়ে এনেছে উঠোনের আঙিনায়। সেই কান্না বেলুড় মঠের সন্ধ্যারতির কাসরঘন্টার থেকেও মনকে বেশি করে নাড়া দিয়ে যায়। এ তো ছোট্ট একটা অবলা শিশুর করুণ মিনতিতে তার মা’কে কাছে পাওয়ার ডাক। এখানেই রয়েছে জীবনের আসল সন্ধ্যারতি। পূজার নৈবেদ্যর মধ্যে নয়। সন্ধ্যারতির পূজার নৈবেদ্য যেন, কোথায় মিলেমিশে গেছে, এক না শোনা অন্তরের ঝংকারে। মায়া-কায়া মিলেমিশে একাকার, মাতৃত্বের  না-চেনা সুরের ছন্দে। নব-রূপে নতুন আনন্দে। মনের গভীর অপূর্ণ অন্ধকারে আলোর স্পর্শে।

মোহন বাঁশিটা নিজের এক চিলতে আস্তানা থেকে বেরিয়ে এসেছে, বিশ্ববাসীর প্রশস্ত আলোকে, সারদা মায়ের অপার স্নেহের করুণায়। মাতৃবন্দনার প্রতীক, দেবী দুর্গা থেকে কালী নতুন আভরণে সাজছে। নতুন বেশে। প্রতীক তো আমাদেরই তৈরি বিগ্রহ, না চেনা অন্তর্যামীকে নতুন ভাবে চেনার। রূপের ঊর্ধ্বে অরূপকে, নতুন ভূষণে সাজিয়ে, নতুন সুর পূজার থালা থেকে অবচেতনের বদ্ধ কুঠরিতে। কখনো কালী মন্দিরে দেবীর বন্দনাগানে ‘মা কী আমার কালো রে…’ কখনো দুচোখ ভাসিয়ে হৃদমাঝারে কালীমূর্তির ধ্যানে ‘এ কালো সে কালো নয় গো শ্যামা, ভুলাবি কী মা মায়ার জালে?’  কৃষ্ণভক্তরা তাদের সুরে তাল মিলিয়ে গায় ‘কালাচাঁদের রূপ দেখলে কী আর কেউ ওকথা বলতে পারে?

কিন্তু মা তো আরাধ্য বিগ্রহের বাইরে একটা চেতনা, একটা অনুভূতি।

মুক্তির পথ।

শান্তির পথ।

চেতনার উত্তরণ।

শূন্যতার মধ্যে পূর্ণতার আবেশ।

সেই চেতনা নিজস্ব পরিমণ্ডল থেকে সেজে ওঠে মাতৃভূমির আরাধানায়। তাই বিবেকানন্দ কন্যাকুমারীতে বসে দেখতে পারেন অন্য এক মা’কে। জন্মভূমি মা। ভারত মাতাকে। যা, যে কোনও দেশের, যে কোনও জাতির ক্ষেত্রে সমান ভাবে প্রযোজ্য। ‘জননী জন্মভূমি স্বর্গদপি গরীয়সী’। কত যুদ্ধ লড়া হয়েছে এই জন্মভূমি ধাত্রীর জন্য। কত লোক কুর্বান দিয়েছে মাতৃভূমির মাটিতে স্বাধীনতার জন্য। ‘কলজে তোমার খাক হয়েছে মায়ের দেখে বেইজ্জত, ভাইরা লাথ কুত্তা বনে জালিম খানায় দেয় মদত, কেউ বা বলে হিন্দু বুলি, কেউ বা বলে মুসলমান , আল্লা হরি খুন হয়েছে চুপ রয়েছে দাস জবান’সেই মায়ের ডাকে একদিন বেজে উঠেছিল স্বাধীনতার দামামা এক সুস্থ জীবনের স্বপ্নে ‘স্বাধীনতা তুমি উঠনে ছড়ান মায়ের শুভ্র শাড়ির কাঁপন’– সেই মুক্তির পথ তো দেশমাতৃকার প্রতি ভালবাসা আর প্রণাম।

দেশাত্মবোধক চেতনা একদিন ছড়িয়ে বিশ্বের আঙিনায়, নব চেতনায়‘বিশ্বজন আমারে মাগিলে কে মোর আত্মপর, আমার বিধাতা আমারে জাগিলে কোথায় আমার ঘর?’  সেই চেতনার আলোকে কবে ধাত্রী ধরিত্রী হয়ে যায় অজ্ঞাতে, তখনই স্থান, কাল, সময়ের সাঁকো পেরিয়ে বিশ্ব চেতনার নতুন জাগরণ। মানবিকতার স্ফুরণ। মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা। ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’ সে তো বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতি প্রগাড় ভালবাসা। সেখানেই ব্যাপ্তি। অবচেতনের আঁধার পেরিয়ে, চেতনার আলোকে ধৌত হয়ে, প্রেমের পথে উত্তরণ।

তবুও তো চেনা হল না তাকে। কিছুটা উপলব্ধি করে দ্বন্দ্বের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া। অস্তিত্বে ধোঁয়াশা। তাই নিরুপায় হয়ে আবার নিজেকে সঁপে দেওয়া ‘সন্ধ্যা হল গো ও মা, সন্ধ্যা হল বুকে ধর, অতল কালো স্নেহের মাঝে, ডুবিয়ে আমায় স্নিগ্ধ কর’ – এখানেই পরাজয়। অন্ধকারে আরোহণের ব্যর্থতা। দ্বন্দ্বের সামনে দাঁড়াবার ভয়। যেখানে আপেক্ষিক স্বত্বা ঘুরপাক খাচ্ছে চেতনার চোরাবালিতে। এই দ্বন্দ্ব অতিক্রম না করে, নিজ হুতাগ্নিতে না জ্বলে, তো নির্বাণে পৌঁছন যায় না।

হাত ধরে গুটি গুটি পায় যে হাটতে শিখিয়েছিল, সে তো সীমারেখা বেঁধে দেয়নি কোথায় থামতে হবে। পথ কণ্টকাকীর্ণ। চোরাবালিতে পদে পদে স্খলনের আশংকা। জিহাদ। অস্তির সংগে নাস্তির টানাপোড়ন। শ্লেষ, অবজ্ঞা, ব্যর্থতা, পরিত্যাগ। আমিত্বমুখি চেতনার আত্মসমর্পণ। সত্তার কোলে। শুধু একটাই নিশানা। এগিয়ে যাওয়া ছেলেবেলার চাঁদমামার ছায়াঘেরা বনাঞ্চলের আঁকা বাঁকা মেঠো পথে এ পথ যে চলার পথ, থামার পথ নয়…

বারবার ফিরে ফিরে দেখতে নিজেকে। যতদিন না ক্ষুদ্র ব্যক্তিত্ব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় মহাবিশ্বের অধিষ্ঠিতে, যেখানে অস্তিত্বটা অনাপেক্ষিক। জীবাত্মার সংগে পরমাত্মার অবিচ্ছেদ্য মিলনে পূর্ণতা- একমেবাদ্বিতিয়ম ‘সো অহং’ । সেখানে আলো নেই তবু আলোর বন্যা, যেখানে গন্ধ নেই তবু সুগন্ধের ঝর্না, যেখানে কেউ নেই, তবু যেন কার অমৃতস্পর্শে দেহ মন আনন্দে শিহরিত হয়ে ওঠে প্রতি পলে। যেখানে স্তম্ভিত জাগ্রত মহাবিশ্ব বরণ করে নেয় সত্ত্বা আর আত্মাকে পরম স্নেহে। কানে কানে নিঃশব্দে শোনায় এক গম্ভীর প্রণবধ্বনি শান্তির আলোকে, মহাবিশ্বের পরম সত্যের অমৃত কথাঃ

‘ওঁ প্রত্যাগ্যানন্দং ব্রহ্মপুরুষং প্রণবস্বরূপং

অ-কার উ-কার ম-কার ইতি

ওঁ স্বর্বভূতস্থং একং বই নারায়ণং পরমপুরুষং

অকারণং পরমব্রহ্মং ওঁ

ওমিতি ব্রহ্ম ওমিতি ব্রহ্ম…’

Advertisements