রবীন্দ্রনাথের জন্মের দেড়শো বছরেরও বেশি সময় অতিক্রম করার পর একবিংশ শতাব্দীতে বাংলা সংস্কৃতির দিকে ফিরে তাকাবার ইচ্ছেটা থাকেই।

আমি অন্তত আজকের প্রতিষ্ঠিত অস্তিত্ব সংকটে জর্জরিত কোনও ‘মহান কেউকেটা’ সংস্কৃতির বাহক নই যে, কালচক্রে, টাইম মেশিনে নিজেকে স্থগিত, রুদ্ধ, আবদ্ধ করে বলব “রবীন্দ্রনাথ ছাড়া তো আমরা কিছুই ভাবতে পারি না।” সেটা রবীন্দ্রনাথের মহত্বের কাছে নতি স্বীকার, না নিজেদের দৈন্যকে আড়াল করার চেষ্টা, নাকি নিজেদের শূন্যতাকে রবীন্দ্রনাথের মলাট দিয়ে পাতে দেওয়ার যোগ্য করে তুলতে চাওয়া- বোঝা শক্ত। রবীন্দ্রনাথের মহত্ব নিয়ে বিশদভাবে লেখা ও বলা হয়েছে। তাই ওনার প্রতিভা বা সৃজনীশক্তি সম্বন্ধে কিছু বলা নিষ্প্রয়োজন। প্রাসঙ্গিক তাঁরা, যাঁরা রাবীন্দ্রিক অলংকারে ভূষিত হয়ে ক্ষয়িষ্ণু বাংলা তথা বাঙালি সংস্কৃতির বাহক হয়ে দাঁড়িয়েছেন। প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রোত্তর যুগে বাংলা সংস্কৃতি কতখানি এগিয়েছে।

তথাকথিত গৌরবোজ্জ্বল বাংলা সংস্কৃতির অগস্ত্যযাত্রা বেশ কিছুদিন আগেই শুরু হয়েছিল। বিশ শতকীয় কুলীন স্বর্ণযুগের অবসানে তা এক নতুন মাত্রা পেল। একবিংশ শতাব্দীতে কিছুটা এগনোর পর বেশ বোঝা যাচ্ছে, দেশি মিডিওক্র্যাটদের মধ্যমেধার দাপটে সেই সংস্কৃতি যৌবনের অন্তেই জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। প্রৌঢ়ত্ব বা বার্ধক্য জাতীয় কোনও বিশেষ পরিণতির তোয়াক্কা না করেই। ‘বাঙালি বা বাংলা’ বিষয়ক নাগরিক আধুনিকতা, যা একান্তই কলকাতা-ভিত্তিক, তা বর্তমান ভৌগোলিক বাংলায় মাত্র দু-আড়াইশো বছরের উপনিবেশ-পর্বের অবদানমাত্র। এই পর্ব একাই মহাভারতের সাপেক্ষে ‘আঠারোশো’। তার আর কী-ই বা দরকার, দু-দিক থেকেই? গাঢ় আঁধারের এক সুদৃশ্য উত্তরীয় জড়িয়ে সমগ্র বাঙালি ক্রমশ কৈশোরের উচ্ছ্বাসে গোগ্রাসে গিলছে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া সেই সংস্কৃতির উচ্ছিষ্ট। পুরনো দিনের কথায় আক্ষেপ আর অবসরে অশ্রুমোচন। কবিগুরুর জন্মদিন বা মৃত্যুদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, তার ফাঁকে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দর সঙ্গে ঋত্বিক-সত্যজিৎ সমেত উত্তমকুমার, কিশোরকুমার আর পঞ্চম-সন্ধ্যা পালন ছাড়া আজ কি বাঙালির কিছুই দেওয়ার নেই! খিদে-তেষ্টার মতোই স্মরণ-মনন থাকা প্রয়োজন, কিন্তু তাতেই আটকে গেলে তো সৃষ্টি থাকে না।

এন্টার্টেনমেন্টের আঙিনায় ছোটবেলার চেনা সুরগুলো এখনও স্বর্ণযুগের মুকুট পরে ঘোরাফেরা করছে, কিছুটা বিবেক আর কিছুটা কথকের ভূমিকায়। তাল মিলিয়ে দুঃসহ টিভি থেকে বেরিয়ে আসছে নানা ঢঙে রবীন্দ্রসংগীত আর স্বর্ণযুগের উচ্ছিষ্ট বা তার অংশবিশেষ। এই সুরগুলো তো বহুদিনের চেনা। কিন্তু কোথায় যেন একটা অসংলগ্ন ঝংকার ছন্দপতন ঘটাচ্ছে চেনা সুরের না-চেনা ব্যঞ্জনায়। থমকে দিয়েছে সুরের স্বাভাবিক মূর্ছনা। ইন্দ্রিয়ে নির্বাক অসহনীয় যন্ত্রণা। সুর তো প্রাণ স্পর্শ করা ছন্দের ব্যঞ্জনা। অথচ ব্যঞ্জনা আছে, সুর নেই। চাটুকারিতার চাকচিক্য আছে, প্রচারের ধামাকাও আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। হার্টবিট বাড়ানোর উপকরণ থাকলেও, পরিবেশ হৃদয়হীন। বিবর্তনটা অবশ্যম্ভাবী জেনেও, ট্র্যানজিশনটা কেমন যেন সুরহীন যন্ত্রাংশের ক্যাচক্যাচে আওয়াজ। মডার্ন রবীন্দ্রসংগীত। রবীন্দ্রনাথকে আধুনিক বাঙালি সংস্কৃতির অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে কাঁটাছেড়ার নতুন নাম নাকি ইম্প্রোভাইজেশন, তবে চর্চায় নিশ্চিত মূঢ়জনের থিসিস কালচার। যাদের ম্লান, মূক মুখে একদিন ভাষা জোগানোর প্রতিজ্ঞা ছিল।

তবে কি বুড়ো হয়ে গেছি? ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি-বিস্মৃতি থেকে নতুন সুরে আর জাগতে পারছি না? স্বর্ণযুগের পরে কী শুধুই রাবীন্দ্রিক অশ্রুমোচন? মেনে নিতে মন চায় না। রবীন্দ্রকালেই তো অতুল-দ্বিজেন্দ্র-নজরুল প্রমুখের তালে মেতেছিল বাংলা।

এ তো বেশিদিন আগের কথা নয়। গীতিরস মিশে যেত ভাবের অনুভবে। এরা কেউ রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা অতুলপ্রসাদ নন। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত, ভাস্কর বসু, সলিল চৌধুরী বা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই থিরুমলের কণ্ঠে আধুনিক গান চিরায়িত সত্যের বাণী শোনাত ‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ…’ কখনও আবেগে প্রেমিক যুগল গঙ্গার বুকে ভাসতে ভাসতে গেয়ে উঠত‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ বা সলিল চৌধুরী সাজিয়ে তুলতেন সন্ধ্যার আবেশে মোড়া চিরশান্তির বনলতাকে-‘শ্যামল বরণি ওগো কন্যা…’ সুরকার, গীতিকারের কল্পনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেত দেশ-কালের পরিধি ছাড়িয়ে। হেমাঙ্গ বিশ্বাস থেকে কমল দাসগুপ্ত – এক এক করে উঠে এসেছে প্রতিভা। রাইচাদ বড়াল, সলিল চৌধুরী, অনুপম ঘটক, সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। সলিল চৌধুরীর সৃষ্টির পিছনে অন্য এক গণ-সুরের অভ্যুত্থান – অরুণ বসু, মন্টু ঘোষ, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। জাদু ছড়াচ্ছে একদল তরুণ তুর্কির ক্ষুরধার লেখায়, তাঁর স্ত্রী জ্যোতি চৌধুরীর নিভৃত আশ্রয়ে। ষাটের গোড়ার দিকে ওয়েস্টার্ন সিম্ফনির আঙ্গিকে গড়ে উঠল নতুন ধাঁচের জীবনমুখী গান – অরুণ বসুর তত্ত্বাবধানে, রুমা গাঙ্গুলির নৃত্য পরিবেশনায় ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ার, যা ক্রমে বিকশিত হল পরিমল সেনের দক্ষ পরিচালনায়। মানুষের গান। জীবনের গান। প্রতি মুহূর্তের সুরমূর্ছনা এক অ-রাবীন্দ্রিক বিন্যাসে। সমান দক্ষতায় উঠে এল মার্গীয় রসবোধ। কখনও নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনও রবিশঙ্কর, কখনও আলি আকবর, আল্লারাখা, ভি জি যোগ, বড়ে গোলাম আলি খান সাহেব থেকে বিসমিল্লা খান। কিংবদন্তির প্রাচুর্য অবিস্মরণীয় সৃষ্টিমাধুর্যে ভরিয়ে দিতে লাগল অনভূতির বাসনা। বুধাদিত্য মুখোপাধ্যায়, জয়া চৌধুরী, মণিলাল নাগ – অতীত যেন বর্তমানের হাওয়ায় পাখনা মেলে ভেসে যাচ্ছিল ললিত গৌরী থেকে বাসন্তী কেদার হয়ে ভূপনাথ, শাওনি কল্যাণে। শুভ্র বরণ এক অনন্ত সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নীরবতার বাতাবরণ সরিয়ে, সুরের সূক্ষ্ম কারুকাজ সাজিয়ে চলেছে একদল যুগস্রষ্টা। প্রভাতের স্তোত্র থেকে সন্ধ্যার দেবারতি। সুরের আরাধনার সময়ও যেন সুরকেই বলছে ‘তুমি আমার ভোরের বেলা ঝিম দুপুরের দানশেষ বিকেলে লালের ছোঁয়া নীল তারাদের গান’

সেই হারিয়ে যাওয়া তারাদের ভিড় থেকে, অনন্ত সময়ের কিছুটা ব্যাপ্তি পেরিয়ে, সেই ‘নীল তারাদের গান’ কি কেউ আজও খোঁজে? শুধু আমাদের মতো কালহীন সময়ের মাঝদরিয়ায়, অকুলে ভাসা কিছু লোক ছাড়া? অতীতের পালছেঁড়া দমকা হাওয়ায় ভেসে যাওয়া নৌকোটা যেন অকুল সমুদ্রে ভাসছে, নোঙরের আশায়। ক্ষণিক আয়ুর মধ্যে প্রাণ খুঁজছে বর্তমানের কাছে। স্নেহের দাবিতে স্মৃতিকে পিছনে সরিয়ে আশ্চর্য অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে বেড়াচ্ছে একটা অস্পষ্ট অবয়ব। নতুন ছবি। নতুন চিত্রপটে যা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে জীবলোকের চাওয়াকে এক নির্দিষ্ট মোহনায়। খালি মোহনার ঠিকানাটা এখনও জানি না। তারাদের পূর্ণতার আস্ফালনে তো শুধুই শূন্যতার রাগ শুনে চলেছি। হাজার লোকের ভিড়ে কোথায় যেন অন্তরের নির্জনতা আজ গ্রাস করছে। যা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এক বেলাভূমির তেপান্তরে, নির্জনে। সহস্রকোটি গাছের বনাঞ্চলে। একটু রং চাই। একটু ছন্দ চাই। একটু সুর চাই। নাই বা হল দয়িতার হাতে হাত রেখে ‘আকাশ পানে চেয়ে চেয়ে, সারা রাত জেগে জেগে’ স্বপ্ন দেখা। দমকা হওয়ার মতো নতুন সুরের ব্যঞ্জনা এঁকে যে লোকটি এসেছিল, ‘এই যে দেখেছি আবছায়াটা লাগছে ভালো, ঘরের কোনে একটি মাত্র মোমের আলোকার তার কী? আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি’, সেই সুমনও স্বপ্ন হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে মাঝ দরিয়ায় ঘুরপাক খাচ্ছেন। ভোল পাল্টে, অশুভ আঁতাঁতে, সর্বসৃষ্টি বিসর্জন দিয়ে, দেশোদ্ধারের কনফিউজড স্লোগানের কালচক্রে হারিয়ে গেলেন। অকুলে হাল ধরার অক্ষমতায়, নাকি আত্মজিজ্ঞাসার আতঙ্কে।

বিভূতিভূষণ, প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ, এক নতুন চেতনার স্ফুরণ। অনেকাংশে রবীন্দ্রনাথের থেকেও এগিয়ে। কিন্তু মানসিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ বাঙালি এদের থেকে সাহেবি উপাধিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তাই কালচক্রের আবর্তনে এরা ম্রিয়মাণ। ফাইন্যানসিয়ালি এরা নন-বেনিফিসিয়াল। তাই ওদের  ভুললে ক্ষতি নেই। বরং আন্তর্জাতিক রবীন্দ্রনাথকে পাকড়ে যদি কিছু কামিয়ে নেওয়া যায়, সেটাই শ্রেয়। কবিগুরু তাই সৃষ্টির দূত থেকে বাণিজ্যিক ভূতে রূপান্তরিত হলেন। বাড়ল সাংস্কৃতিক তালকানাদের আধুনিকতার উচ্ছ্বাস। বো-ত-লপুর হয়ে গেল এলিটদের কালচাঁড়াল পীঠস্থান। নাই বা পড়া হল রবীন্দ্রনাথ। নাই বা বোঝা হল আন্তর্জাতিক-তাকে। রাব-ইন্ডিক উত্তরীয় চড়িয়ে স্কচে চুমুক দিলে স্ট্যাটাস বাস্তবিক বাড়ে, তবে পুরুষানুক্রমিক হিসেবেই খেয়াল রাখবে, রবিটবি যেন শখের হোমিওপ্যাথি আর জ্যোতিষের থেকে বেশি নম্বর না পায়।

সৃষ্টি যখন মিডিয়ার ঘেরাটোপে, যখন লাখ-লাখের পাবলিসিটি, ব্যানার-ফেস্টুন লাগিয়েও ছবি বাজারে চলেছে না, তখন খারাতপ্ত অস্তিত্ব সঙ্কটে হঠাৎ শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ জাদু ছড়াল। ভাসিয়ে দাও সেই স্রোতে নিজেদের। বক্স অফিসে ভরাডুবি হবে না। শরদিন্দুর গোয়েন্দার চর্বিত-চর্বণ করে সিরিজ বানিয়ে বাজারে ছাড়তে থাক। মধ্যরাতের পার্টি আর পেজ থ্রি-তে অস্তিত্বটুকু বেঁচে থাকবে। আর কিছু না হোক, খেয়ে-পরে টিকে থাকা যাবে। ব্যোমকেশ ছাড়া শরদিন্দুর আর কিছুই নেই!

কর্পোরেট আবহে কিছু সাহিত্যিক ও কবি বেরিয়ে এলেও, শেষ পর্যন্ত বাজারি কাটতির দিকে চেয়ে তাদের কেউ গুণগত মান ধরে রাখতে পারেননি। সমরেশ বসু, রামাপদ চৌধুরী, গৌরকিশোর ঘোষ, নাবারুণ ভট্টাচার্য বা সন্তোষ ঘোষ, সুবোধ ঘোষ, সুনীল-শক্তি, শীর্ষেন্দু-অতীন, বিমল করের পর বাংলা সাহিত্যও পেশাগত দোলাচলে ভরাডুবির মুখে। ১৯৪০-এ যে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা তীক্ষ্ণ-তীব্র হুঙ্কার ছাড়ল ষাটের দশকে। বাংলার নিজস্ব আঙ্গিক ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে। অসীম রায়, দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হাংরি গ্রুপের মলয় ও সমীর রায়চৌধুরী, অরুণেশ ঘোষ, শৈলেশ্বর ঘোষ, বাসুদেব দাশগুপ্ত, তুষার ও ফাল্গুনী রায়, সুভাষ ঘোষাল, সুব্রত মুখোপাধ্যায়রা কর্পোরেট-পুষ্ট লেখক নন, তাই এদের পরিচিতিও সীমিত। ১৯৬০ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত এই টানাপোড়েনের মধ্যে লেখকদের সহায় ছিল যুগান্তর ছাড়াও বেশ কিছু প্রকাশক সংস্থা। আশির দশকে সেই যুগান্তর ও অন্যরা ক্রমশ বিলীন হওয়ার পর থেকে কর্পোরেট যাদের প্রজেক্ট করছে, তারাই সাহিত্যিক। তার বাইরে সাহিত্য বলে কিছু হয় না। বলা যায়, একাধিপত্যের সেই দিন থেকেই শুরু হল বিপর্যয়। নব্বইয়ে বিশ্বায়নের হাত ধরে গড়ে উঠল নির্দিষ্ট ধাঁচে লেখক তৈরির কারখানা। সাহিত্যের বিবর্তন রীতিতে অনেক নাম বাজারে বিক্রিও হল। অনেক সাহিত্যিক বেশ সন্দেশের ছাঁচে তৈরিও হল কর্পোরেট ভাষার স্লোগানে নিজের জায়গা বুঝে নিতে। কিন্তু কেউ রেখাপাত করতে পারল না। অথচ রসেবশে থাকা বাঙালি নতুন কিছু খুঁজছে, যা এরা দিতে অপারগ। সেই পাবলিসিটি এল, কিছু আবার স্টারও হলেন।

কিন্তু সাহিত্য তো স্টারডম নয়, কালানুগ নিজস্বতা। চিন্তাধারাকে কর্পোরেট-শোভন মখমলে ফেলে নাচনির স্টারডম সমেত বিক্রি করে খ্যাতনামারা আরও প্রখ্যাত হলেন। ঠ্যাঙে দড়ির জ্যাঠামিতে হারিয়ে গেল সৃষ্টি। গায়েব হল কৃষ্টি। সুদৃশ্য ওড়না জড়িয়ে ভূরি ভূরি অর্থহীন লেখা বিক্রি করে বছরের আয় গুনলেন কর্পোরেট। নাম, টাকা, স্টারডমের বিনিময়ে সাহিত্য কখন ব্যাকসিট নিয়েছে তা বুঝতে পারলেন না। কিংবা চাইলেন না। যুগান্তকারী সৃষ্টি অর্থের মায়াজালে হয় না। তা তখনই সম্ভব, যখন একান্ত নিজস্ব তাগিদে অন্তর থেকে বেরিয়ে আসে। রবীন্দ্রনাথের লেখা আজকের যুগেও প্রাসঙ্গিক- কেন? হয়ত স্থান-কালের গণ্ডী ছাড়িয়ে চেতনার ব্যাপ্তিতে, সময়ের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে, মুক্ত বিহঙ্গের মতো অনেকের সঙ্গে ভেসে বেড়াতে পারে, তাই। কর্পোরেট মায়ায় সে অবকাশ কোথায়?

সাবালক বাঙালি আবার নাবালকের আনন্দ ফিরে পেল। হারিয়ে গেল সেরিব্রাল ম্যাচিওরিটি, অর্থাৎ মানসিক সাবালকত্ব, মানসিক বিস্তৃতি। সাহিত্য তখনই সাবালকত্ব অর্জন করে, যখন অজানা অচেনা দিকগুলো তার মধ্যে দিয়ে প্রকাশিত হয়। এখন বাঙালির সময় সিরিয়াল, মিরাক্কেল, বিগ বস, ভুল তথ্যসমৃদ্ধ দাদাগিরি আর স্পন্সর্ড মিডিয়ার চর্বিতচর্বণে ভারাক্রান্ত। বাঙালি ভুল শিখছে। ক্ষতি নেই। মিডিয়ায় স্টার হচ্ছে। চিন্তাধারা এখন ফেসবুকে, সেলফি আর হোয়াটস অ্যাপে সীমাবদ্ধ। সৃষ্টির আগে সেলিব্রিটি হতে হবে, তাই সাতসকালে বোঁচকা কাঁধে বেড়িয়ে পড় মিডিয়া-বাবুদের পদলেহন করতে। গতিহীন ঘূর্ণিপাকে চিন্তাশক্তি ফিউজড- হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্কস টুডে, ইন্ডিয়া ফরগট ইয়েস্টার্ডে।

আমরা একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে গেছি। বিবর্তন হয়েছে চিন্তাধারায়। বিবর্তন হয়েছে সাহিত্যেও। প্রশ্ন ওঠে, কোনটা সমাদৃত? কোনটা হাইপ? কোনটা পূর্ণতা? কোনটা বিক্রির পণ্য? সেই চিন্তাশক্তি কেড়ে নিয়েছে ইডিয়েট বক্স। রূঢ় সত্যটা বাঙালি দেখতে চায় না, ভয় পায়। তারা ভালবাসে আলো-আঁধারিতে থাকতে। কেচ্ছার সরলতাকে আঁকড়ে সত্যকে এড়িয়ে যেতে। রূঢ় বাস্তব যে বড় নিষ্ঠুর, কঠোর, ভাবাবেগ বিচ্ছিন্ন। তাই অর্থ থাকতেও অস্তিত্ব-সঙ্কটের শিকার কিছু ‘নব্য বাবু’ এল কালচারাল মজলিসে নজরানা ছুড়তে, মেহফিল সাজাতে। দিনে-রাতে-প্রকাশে-অলক্ষ্যে। স্পন্সর্ড মিডিয়ার কারুণ্যে কিছু সেলিব্রিটি বাজারে বিকোতে এল। সৃষ্টিকে পিছনে ফেলে সেই দিনরাতের মেহফিলে নিজেদের বিক্রি করার জন্য বহু মিডিওক্রিটি আশ্রয় নিল। স্টার হল। একটু লাইমলাইটের জন্য যে কোনও মূল্যে বিকোতে প্রস্তুত। আচ্ছা, রবীন্দ্রনাথ কী সেলিব্রিটি ছিলেন? নিশ্চয়ই নয়। ‘এ তো হাটে বিবার নয়… কণ্ঠে দিব আমি তাঁরে… যারে বিনামূল্যে দিতে পারি’ নজরুলের আভরণে তারা নতুন সুর ভাঁজল ‘আমি অর্থের গান গাই, আমার চক্ষে টাকাই সত্য, টাকা ছাড়া আমি নাই’  সাহিত্যের নামে রবীন্দ্রনাথ বিকোচ্ছে স্পন্সারশিপের নিলামে। তাঁর ভুল তত্ত্ব বিক্রি হচ্ছে। বেস্টসেলার হচ্ছে। “ওনাকে পড়েই তো রবীন্দ্রনাথকে জানলাম”- হায় পোড়া কপাল দিকশূন্য বাঙালির। এখনও চিনতে শেখেনি শূন্যতার কেন্দ্রবিন্দু? তোতা কাহিনির বাইরে আসল সত্যকে! মিডিয়া জিনিয়াস বানাতে পারে না। তাই রাবীন্দ্রিক দর্শন নয়, রাবীন্দ্রিক কেচ্ছা হুড়মুড়িয়ে বেস্ট সেলার। এখন প্রশ্ন ওঠে, তাহলে কী এটাই বাংলার সাহিত্য? স্বামী বিবেকানন্দ আর নিবেদিতার রাসলীলা! কিংবা কথামৃত ভুলে রামকৃষ্ণর নারী দর্শন? ‘সৃষ্টি তুমি আত্মদহনে জ্বল, যদি নতুন সুরে, নতুন তানে, না কিছু বলিতে পার’

তবে কী সে যুগেই সব ছিল? আজ এই যুগে কি আর কিছুই নেই? যদি তাই হয়, তবে কেন আজ এই বিক্ষিপ্ত মন!

সময় হয়েছে রবীন্দ্রনাথ থেকে বেরিয়ে রাবীন্দ্রিক চেতনার ঊর্ধ্বে উঠে নতুন কিছু বলার। সেখানেই কৃষ্টির প্রগতি। চিত্তের মুক্তি। আগামী সংস্কৃতির নতুন চিত্রগাথা। নতুন প্রাণের জোয়ারে ভাসা বলিষ্ঠ চিন্তা। যা স্পন্দন তুলবে নিঃশব্দে, নীরবে, মনের দেওয়ালি উৎসবে। না হলে রবীন্দ্রনাথকে সঙ্গী করেই ক্রমশ বাঙালি সংজ্ঞার অপমৃত্যু ঘটবে।

বন্ধুবর আশিস চট্টোপাধ্যায়ের কলমে তাই জীবন জিজ্ঞাসার স্বপ্ন আবার উঁকি দেয়ঃ

‘জীবনের ঝরে পড়া ধানগুলো

খুঁটে খুঁটে খেয়ে চলে স্মৃতির পাখিরা

ওগো ব্যাধ তুলো না গাণ্ডীব 

তার চেয়ে হও তুমি নীল বাতিঘর 

দেখাও দিশার আলো নিশার আঁধারে’

অন্ধকারে দমকা আলোর রোশনাইয়ের মতো সেটাই তো আগামীর বীজমন্ত্র। খরাতপ্ত আকালের মধ্যে বর্ষার না-চেনা মেঘমল্লার।

কবিগুরুর স্বপ্ন, তাঁর আড়ম্বরের মধ্যে নয়। নতুন চেতনার স্ফুরণে। ‘এখন করিছে গান সে কোন নতুন কবি তোমাদের ঘরে?’ দেড়শো বছর পরেও সেই বিশ্বচেতনার স্রষ্টাকে খুঁজছি সাহিত্যের পাতায়, সৃষ্টির কাব্যগাথায়। যা প্রচারের দাপটে প্রকট না হয়েও সদা প্রোজ্জ্বল। হাজার ব্যর্থতার মধ্যেও পথের দিশারি। আগামীর পাথেয়। নাই বা রইল উচ্ছ্বাসের ঘনঘটা। নাই বা রইল রঙিন বর্ণচ্ছটা। ধূসর বর্ণহীন অচলায়তনের অনাড়ম্বরেই হোক সেই ‘ব্যথার পূজার সমাপন’নতুন চেতনার উদ্ভাসে। কবিগুরুর ইতিহাস সাক্ষী রেখেই আগামী সীমা-অসীমের ধোঁয়াশা থেকে মুক্ত হয়ে নির্দিষ্ট মোহনায় পৌঁছতে পারবে। দোলাচলের বাইরে জীবাত্মা আর পরমাত্মার যুগলবন্দিতেই হবে সাধনার পূর্ণতা- একমেবাদ্বিতিয়ম ‘সো অহং’

আলোগুলো নিভেছে, ফিউজটা জ্বলে গেছে প্রচারের দাপটে। বিজ্ঞাননির্ভর জীবনেও মায়াবী রাতে তারাদের দিকে উদাস চেয়ে থাকি, ছোঁয়ার আশায়। কবে আবার নতুন করে জীবনটা নিওনছটার বাইরে চাঁদের মায়া দেখবে? কবে আবার আজটা কাল হবে, পরশুটা আজ।

চিত্রশিল্পী অদিতি চক্রবর্তী

Advertisements