Canvase (Front Page)

উপন্যাসের জন্ম ইতিহাস বহু প্রাচীন।

বাংলায় সাহিত্যে প্রথম সার্থক উপন্যাস বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনী। প্রশ্ন আসতেই পারে সার্থক উপন্যাস কাকে বলে? প্রখ্যাত লেখক মোপাসাঁও স্বয়ং এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। হেনরি জেমস তার সুবিখ্যাত আর্ট অফ ফিকশান প্রবন্ধে বলেছেন “As people feel life, so they will feel the art that is most closely related to it. This closeness of relation is what we should never forget in talking of the effort of the novel”. এই ‘closeness of relation’  উপন্যাসের শিল্প বিচারে প্রধান বিষয়।

উপন্যাসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দ্বন্দ্ব বা conflict। দ্বন্দ্ব গড়ে ওঠার একটি  সাধারণ সূত্র হল Main+Opposition=Conflict. অর্থাৎ মুখ্য চরিত্রের সঙ্গে বিপরীতমুখী চরিত্র বা খল চরিত্রের সংঘর্ষে দ্বন্দ্ব সংঘটিত হয়। এবং এই দ্বন্দ্বের মাধ্যমে উভয়েই একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছাতে চায়। এই দ্বন্দ্বের কিছু ভাগ হতে পারে Inner Conflict বা অন্তর্দ্বন্দ্ব, Outer conflict বা বহির্দ্বন্দ্ব এবং Jumping conflict বা আকস্মিক দ্বন্দ্ব। ব্যক্তির নিজের সঙ্গে নিজের দ্বন্দ্ব; অন্তর্দ্বন্দ্বের অন্তর্ভুক্ত। বহির্দ্বন্দ্ব হল ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের বা পারিপার্শ্বিক পরিবেশের দ্বন্দ্ব। আর অনভিপ্রেত ঘটনা বা দুর্ঘটনার ফলে যে দ্বন্দ্ব; তাই আকস্মিক দ্বন্দ্ব। সামাজিক, ঐতিহাসিক, রোমান্টিক, পৌরাণিক প্রায় সমস্ত উপন্যাসে দ্বন্দ্বের এই প্রকাশভঙ্গী পরিলক্ষিত।

ভূমিকায় এত কিছু বলার কারণ একটাই।

অনিরুদ্ধ বসুর উপন্যাস ক্যানভাসে দ্বন্দ্বের বহুমুখী দিক প্রকাশিত। আর প্রকাশিত হেনরি জেমসের সেই ‘closeness of relation’ যা উপন্যাসের পড়তে পড়তে পর্যাপ্ত।

রাধার পর খাওয়া

খাওয়ার পর রাধা

বাইশ বছর এক চাকাতে বাধা।

চেনা চিরারিত ছক। যেন ক্যানন মেশিনে ফোটোকপি। সংসার, পরিবার, সন্তান উৎপাদন। চেনা দুঃখ চেনা সুখ চেনা চেনা হাসিমুখ। তাই জীবনের যবনিকাও পড়ে চেনা চক্রে। কিন্তু চেনা বৃত্তের বাইরে হাঁটতে চায় কেউ কেউ। তারা সংখ্যায় মুষ্টিমেয়। তাই তারা ব্যতিক্রমী। নিজস্ব মনের ক্যানভাসে অনুভূতির রঙে তুলি ডুবিয়ে তারা এঁকে যায় একের পর এক ছবি। শূন্য সাদা পাতায় পূর্ণতা দিতে চায় আজীবন।

পূর্ণতা কি আসে?

পূর্ণতা কোথায়?

অন্তমিলে না অমিত্রাক্ষরে?

ক্যানভাস উপন্যাসের মুখ্যরিত্র নন্দিনী পয়ারের পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে খোঁজেনি দাম্পত্য সুখ। সে বরং অমিত্রাক্ষর কাটিয়েছে জীবন। মেয়েবেলা থেকে  তার চোখে  স্বপ্ন। স্বপ্নে দেখা পুরুষ। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে  তিক্ত তির্যক অভিজ্ঞতা। আগুনে আগুন। জ্বলে পুড়ে যায় স্বপ্নের শরীর। প্রেমিক ইন্দ্রনীল, নাচের শিক্ষক ঋতব্রত, এসকোর্ট কম্পানীর ক্লায়েন্ট সকলেই তার শরীরী উত্তাপ পেয়েছে। পায়নি বিমূর্ত মনের সুপ্ত ক্যানভাস। তুমি তো কেবলই কাম; কামনার কোজাগরী – এ যেন গড়পত্তা পুরুষের হস্তাক্ষর। নারী পুরুষের জ্যামিতিক যৌনতার পরেও অপূর্ণতা থেকে যায়। ঔপন্যাসিক অনিরুদ্ধ বসুর এখানেই  আত্মবিবৃতি – “বাৎসায়ন নারী পুরুষের এতো ভঙ্গি এঁকেও মনের ছবি আঁকতে পারেনি”। রামধনুর সাত রঙের মতই জীবনের সাত রাঙা রূপ তুলে ধরেছেন লেখক। এই সাতরূপী নন্দিনী বিচ্ছিন্ন হলেও তা একই জীবনের সপ্ত সুরের মতো। সারা জীবন ধরে সে চেয়েছে তার মনের ক্যানভাস রাঙাতে। উপন্যাসের শেষে সে পেরেছে। সে পেরেছে এই ছবি আঁকতে। রং তুলির নিখুঁত টানে নন্দিনী ছুঁয়েছে আত্মজীবনীর আকাশ। আকাশে আকাশে খণ্ডিত ‘আমি’-র রূপ। নন্দিনী খুঁজে পেয়েছে তার নিজস্ব ‘আমি’। এ যেন ‘তখন তেইশ’ চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র তমোদীপের  অনুভূতি – “চারদিকে ছড়িয়ে আছে  রং। কম্পিউটারের ভি জি এ প্যানেল থেকে বেশি। মোর দ্যান সিক্সটিন মিলিয়ান কালারস। আমার শিল্পী হওয়া কে আটকায়!” গহন অনুভূতির রং-এ স্নাত দুজনেই। নন্দিনী এবং তমোদীপ। একজনের অনুসন্ধান প্রকৃতির মাঝে। অন্যজনের গভীরে। দিগন্ত বিস্তৃত ‘আমি’-র আকাশ। সত্তার সমুদ্রে ডুব দেয় উভয়েই। খুঁজে পায় নিজস্ব ‘আমি’। ধান্দার বিশ্বে বার বার ফাঁদে পড়েছে নন্দিনী। সহজ সরল রৈখিক পথ বদলেছে নিমেষেই। জটিল থেকে জটিলতর হয়েছে জীবন। জীবনের বাঁকে বাঁকে শুধু শরীরী খেলা। দিকশূন্য র‍্যাট রেস। কেবলই ছুটে চলা। মেঘে ঢাকা তারার নীতা বলেছিল – “দাদা আমি বাঁচতে চাই”। তেমনই করুণ কাতর মনস্বর।

কী যুগ্ম যোগসূত্র!

দুজনেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বিপর্যস্ত। সময়ের ব্যবধানে তাদের যন্ত্রণার উৎস ভিন্ন। তবুও নীতা আর নন্দিনী মিলে মিশে যায় একই জীবনের ক্যানভাসে। যেখানে রক্ত আর রং একাকার। নীতা বা নন্দিনীর অহরহ রক্তপাত; সে তো খ্রীষ্টের নিয়তি। নন্দিনী কী এ যুগের নীতা? বা তার স্মৃতির পুনরাবিষ্কার? ক্যানভাস উপন্যাস পাঠে এমন অনেক প্রশ্ন ঝিলিক দেয়।

প্রকৃতপক্ষে অনিরুদ্ধ বসু উপন্যাসের ফর্ম নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন। ফেসবুকের এক অচেনা মহিলার বাক্যালাপ থেকে তৈরী তিনশ বাহান্ন পৃষ্ঠার উপন্যাস। নন্দিনীর জীবন কাহিনী বর্ণনা ভিত্তিক হওয়া সত্ত্বেও সরল রৈখিক নয়। জীবনের এখানে বহু বিন্যাস। বিন্যস্ত নন্দিনীর মনস্তত্ত্ব। কী আশ্চর্য পরিসমাপ্তি! উপন্যাসের উপংসহারে লেখকের অকপট স্বীকারক্তি। নিজের সত্তাকে বিযুক্ত করে আয়োজিত লেখক পাঠক কল্পিত কথোপকথন। এ যেন ব্রেষ্টের এলিয়েনেশন।

প্রচ্ছদ শিল্পী অদিতি চক্রবর্তীর রং তুলির মেধাবী উপস্থাপনায় উজ্জ্বল ক্যানভাসের প্রচ্ছদ। বইয়ের ছাপা ও বাঁধাই সর্বাঙ্গীন সুন্দর। দ্বন্দ্ব অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং আকস্মিক দ্বন্দ্বের সমাহারে অনিরুদ্ধ বসুর লেখনী উপন্যাসের গতিকে দ্রুত করে। সেই সঙ্গে মুগ্ধ করে লেখকের পোয়েটিক অ্যাপ্রোচ। যার ফলে প্রথম পাঠের পর দ্বিতীয় পাঠের আবেদন জন্মায়। সব শেষে বলি, ক্যানভাস এবং নন্দিনী একে অপরের পরিপূরক হলেও তা ব্যক্তি অতিরিক্ত এক ধারণা।

হয়ত আমাদের অবচেতনের ক্যানভাস।Canvase Advertisement

http://www.smritipublishers.com/bookdetail/Canvase/33/

Advertisements