Canvase (Low Resolution)

http://www.smritipublishers.com/bookdetail/Canvase/33/

লেখক প্রখ্যাত প্লাস্টিক সার্জেন হলেও তাঁর প্যাশন হল লেখা। এ পর্যন্ত প্রকাশিত ৬ খানি উপন্যাস। এর ৪ টি-র ইংরেজি ভাষান্তর হয়েছে – সবগুলোতেই স্বনিষ্ঠ তিনি নানাভাবে নানা ফরম্যাটে সত্যের সন্ধানে মানুষের মনুষ্যত্বের গভীরে আলো ফেলতে চেয়েছেন। আদর্শবাদী সুঅধীত এই সাহিত্যিক প্রত্যক্ষ ও পরীক্ষিত জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে ও দেশ-বিদেশের বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করে এই উপলব্ধিতে এসেছেন – মানুষই প্রতিনিয়ত মানুষের নৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। শ্রেয় প্রেয়-র দ্বন্দ্বে প্রেয় প্রাধান্য পেতে পেতে সীমাহীন ভোগসর্বস্ব জীবন তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আর একাজে মদত দিচ্ছে কর্পোরেট দুনিয়া। এই দুনিয়ার মানুষের জীবন সম্পর্কে যত কম জানা যায় ততই মঙ্গল; যত কম লেখা যায় ততই বাস্তব সত্যের আর একটা দিক উন্মোচিত হতে চায় – যা হল, মানুষ সব বিষয় শেষ কথা বলতে চাইলেও তা বলতে পারে না কারণ সে নিজেই জানে না, তাঁর অভীষ্ট কী। সৃষ্টির একটা নিজস্ব উন্মোচন-সত্তা আছে যা চিরকাল অধরাই থেকে যায়। কবি সাহিত্যিক শিল্পী এই অধরার দিকেই তাঁদের কালি কলম সব ছেনি হাতুড়ি এগিয়ে নিয়ে যান। এই অন্তহীন যাত্রায় পিছুটান চলে না, অসতর্কতা চলে না। নিষ্ঠা চাই, সততা চাই। অনিরুদ্ধর অন্বেষণে কোনও ভেজাল নেই; লেখালেখি করে পাবার আবিশ্ব-আশা তাঁকে এখনও পর্যন্ত বিচলিত করতে পারেনি। মনুষ্যত্বের অন্তহীন পরাভবের মধ্যে পড়ে এ যুগের মানুষ কেমন আছে, শ্রেণিভুক্ত সমাজস্তর রচনা করে ভোগসর্বস্ব জীবনের অতিপ্রসারে এই মানুষ কোনও শক্তির বলে সমাজ রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের জীবন কী ভাবে বিধ্বস্ত হচ্ছে – তাঁর উপন্যাসগুলিতে এই ছবি ধরা পড়েছে। প্রশ্ন হল, তবে কি মানব-সভ্যতার প্রসার ঘটেছে না? সভ্যতা শব্দের আসল অর্থ সভার মধ্যে আপনাকে পাওয়া আর সেই সভায় সকলের মধ্যে নিজেকে উপলব্ধি করা। এই সভা শব্দের ধাতুগত অর্থ – যেখানে আভা, আলোক আছে। বিশেষভাবে বললে মানুষের প্রকাশের আলো একলা নিজের মধ্যে নয়, সকলের সঙ্গে মিলনে। এই আলোর খোঁজই জীবন। অনিরুদ্ধ এই আলোর সন্ধানে আপন সৃষ্টির ভেতর দিয়ে বের হয়েছেন। অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ – তাঁর অনুসন্ধানের দর্পণে প্রতিফলিত হয়ে একটা সত্যই প্রকাশ করে – মানুষ এখনও মনুষ্যত্ব অর্জনের পথে এগিয়ে চলেছে মাত্র। দস্যু রত্নাকরের বাল্মীকি হয়ে ওঠার পুরাণ-কাহিনি, যযাতির পুত্র-যৌবন ধার করে বৃদ্ধ বয়সে সম্ভোগস্পৃহার অগ্নিদহণ; গৌতম বুদ্ধের বোধিসত্ত্বলাভ – এমন অজস্র উপমা উপকরণ প্রাচ্য জীবনের বহমান ছবি। সর্বত্রই একটিই সত্য স্পষ্ট হতে চাইছে – তা হল, মানুষের কিছু হয়ে ওঠার সংগ্রাম। একটি যুগের কণ্ঠস্বর অন্যযুগে অনুরণিত হয়। বহু যুগকণ্ঠ ধারণ করে আছে যে সত্য, তা হল প্রেম মৈত্রী করুণা দয়া দান ত্যাগ তিতিক্ষা সহিষ্ণুতা। সৎ সাহিত্যিক কবি শিল্পী যুগবাণীর উদ্গাতা। এখানে ব্যাপক অর্থে সকলেই শিল্পী। এই শিল্পী প্রতিটি বস্তু বিষয়ের ওপর গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রয়োগ করেন। এই দৃষ্টি শুধু জীবনের সমালোচনা নয়, বহিরঙ্গের দিকে তাকানো নয়, বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা দিয়ে, দর্শনের অভিরঞ্জন প্রয়োগ করা হয়, এখানে আত্মার খোঁজই শেষ কথা। এর জন্য অন্তঃক্ষরণ ও আত্ম নগ্নায়ন চাই – শুদ্ধতা চাই। তবে একটা ডিভিনিটি, রচনার প্রসাদগুণ গুণ হয়ে ওঠে। চমৎকারিত্ব দিয়ে, স্পার্ক রচনা করে এই ডিভিনিটি আয়ত্ব করা যায় না। অতলান্ত গভীরতায় উত্তাল সমুদ্রে ঘূর্ণিময় বিপদ-সংকুল যাত্রায় মানুষের একটিই লক্ষ্য – আপনার আত্মার সম্মান। এই সম্মানে সভ্যতা এক একটি দ্বীপের মতো। স্মৃতিসত্তা যেখানে চিহ্ন রেখে যায় মহাকালের যাত্রাকে অপ্রতিহত রাখতে। অনিরুদ্ধ বুঝেছেন উপন্যাস কোনও তত্ত্ব নয়, শুধুমাত্র শাখাপ্রশাখা সমৃদ্ধ কাহিনি মাত্র নয়। তাঁর সবগুলি উপন্যাসে কাল ও কালজ্ঞানের ভেতর দিয়ে তিনি মানব সম্বন্ধের নানা বর্ণময় ছবি এঁকেছেন। তাঁর রচনার ক্যানভাসে তিনি মনুষ্যত্বের রংটি শেষ পর্যন্ত ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। মানুষ কেবলমাত্র প্রাকৃতিক নয়, সে মানসিক। এই মানবিক ভাবানুসঙ্গেই জগত মণ্ডিত হয়। একবিংশ শতাব্দীর জীবনযাত্রায় মানুষের জীবনের রং রূপ কী তা সদ্ভাবে জানার জন্যে সৎ সাহিত্যই রচনা করতে হবে। এ সাহিত্য কী রচিত হচ্ছে? এখন লেখকের হাতে অ্যাজেন্ডা ধরিয়ে দেওয়া হয়, কর্পোরেট চাহিদা না মেটালে সাহিত্যিক হালে পানি পায় না। তাই বর্তমানে সৎ সাহিত্যের আকাল চলছে বলা যায়। অনুমান নয় নিঃসংশয়চিত্তেই এ কথা বলা যায়, এখনকার সাহিত্য পরজীবী। অনিরুদ্ধ এ ক্ষেত্রে ব্যাতিক্রমি।

ক্যানভাসে উপন্যাসটির ভূমিকায় আশিস কুমার চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসটির মর্মবানীর নির্যাস যথার্থভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন। কাহিনি ছাড়া উপন্যাস হয় না। কাহিনির ভেতর দিয়ে জীবনের সত্য আর্টের সত্য হয়ে ওঠে। ক্যানভাসে এই সত্যটি লেখক অভিনব – আর্টের ফর্ম তৈরি করে মুখ্য চরিত্র নন্দিনীর জীবনে ফুটিয়ে তুলেছেন। নন্দিনীকে নানা বাস্তব পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে কর্পোরেট চাহিদা মেটাতে হয়েছে। এই জীবন সংগ্রামের ভেতর দিয়েই প্রেম এসেছে জীবনে। অর্ণব তাকে সাংসারিক বন্ধন দিয়েছে সন্তান দিয়েছে, বেঁচে থাকার আনন্দ দিয়েছে। যখনই নন্দিনী এই আনন্দসুখ পেয়ে জীবনে থিতু হতে চেয়েছে, তখনই এক ভয়ঙ্কর বিপর্যয়। অর্ণবের মৃত্যু দুর্ঘটনায়। এখন তার একমাত্র অবলম্বন পুত্র অনীশ ও তার জীবনে চলার পথটিকে সুন্দর করে তোলা কী করে সম্ভব তার খোঁজ করা।

অনিরুদ্ধ সিরিয়াস লেখক এবং বিশ্বজীবনকে আত্মস্থ করে তার এই প্রত্যয় দৃঢ় – বিশ্বের মানুষকে প্রাচ্যের দিকেই মুখ ফেরাতে হবে একদিন না একদিন। তবে সাহিত্য সৃষ্টিতে যে দিকটি তিনি বারবার কম গুরুত্ব দিয়েছেন তা হল, ‘ডেলাইট প্রিন্সিপ্যাল’। ছোট্ট ছোট্ট ডিটেলিং-এর মধ্যে দিয়ে উপন্যাসের প্রাণরস ফুটে ওঠে। এই রসের জোগান উপন্যাস পাঠে পাঠককে প্রাণিত করে, একবার নয় বহুবার পড়তে ইচ্ছে যোগায়। সমকালের হয়েও তাঁর পাঠক সর্বজনীনতা পাবে না, কারণ তিনি সাধারণদের জন্য লেখেন না। তিনি বিশেষ পাঠক শ্রেণির লেখক, যে পাঠক উচ্চশিক্ষিত। শুধুমাত্র মাতৃভাষা জানলে তাঁর উপন্যাসের রস আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। হয়ত এটাই তাঁর লক্ষ্য কারণ যে শ্রেণিকে সাহিত্যে বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন – তাদের হাতেই এখন সাধারণ মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ। রিয়েলিটির মুঠো শক্ত হাতে ধরে তিনি তাঁদের দিকে আঙুল তুলেছেন যারা মানুষ হয়ে মানুষের হৃদয় কুরে-কুরে খাচ্ছে। মানুষের মধ্যে মানুষের পূর্ণতার রূপটি কী তা ধরা পরছে না। ক্যানভাসে একটি সুখপাঠ্য উপন্যাস হলেও তাঁর ভেতরে মানব মুক্তি পথ কোথায় তার দার্শনিক নির্দেশ রয়েছে। আশা করব অনিরুদ্ধর ভবিষ্যৎ সাহিত্যসৃষ্টিতে অতি সাধারণ মানুষ অত্যন্ত সহজভাবে সহজভাষায় উঠে আসবে।

Advertisements