সুরটা বহুদিনের চেনা।

কিন্তু কোথায় যেন একটা অসংলগ্ন ঝংকার বিটস ছন্দপতন ঘটাচ্ছে চেনা সুরের না-চেনা ব্যঞ্জনায়। থমকে দিয়েছে স্বভাবিক সুরের মূর্ছনা। নিয়ে এসেছে নির্বাক অসহনীয় যন্ত্রণা। সুর তো প্রাণ স্পর্শ করা ছন্দের ব্যঞ্জনা। ব্যঞ্জনা আছে, সুর নেই। চাটুকারিতার চাকচিক্য আছে, প্রচারের ধামাকাও আছে, কিন্তু প্রাণ নেই। হার্টবিট বাড়াবার উপকরণ থাকলেও, হার্ট নেই। বিবর্তনটা অবশ্যম্ভাবী জেনেও, ট্র্যন্সিশনটা কেমন সুরহীন যন্ত্রাংশের ক্যাচক্যচে আওয়াজ।

আমি কী তবে বুড় হয়ে গেছি? ফেলে আসা অতীতের স্মৃতির বিস্মৃতি থেকে নতুন সুরে আর জাগতে পারছি না? স্বর্ণযুগের পরে কী শুধু রাবিন্দ্রিক অশ্রুমোচন? মেনে নিতে মন চায় না।

এ তো বেশিদিন আগের কথা নয়। গীতি রস মিশে যেত ভাবের অনুভবে। এরা কেউ রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা অতুলপ্রসাদ নয়। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত, ভাস্কর বসু, সলিল চৌধুরী বা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই থিরুমলের কণ্ঠে আধুনিক গান চিরায়িত সত্যের বাণী শোনাতঃ

‘তোমার ভুবনে মাগো এত পাপ…

সে কী অভিশাপ?

নাই প্রতিকার।

মিথ্যারই জয় আজ সত্যেরও নাই তাই অধিকার’

কখনও আবেগে প্রেমিক যুগল গঙ্গার বুকে ভাসতে ভাসতে গেয়ে উঠতঃ

‘কে প্রথম কাছে এসেছি’

বা সলিল চৌধুরী সাজিয়ে তুলত সন্ধ্যার আবেশে মোড়া চিরশান্তির বনলতাকেঃ

‘শ্যামল বরনি ওগো কন্যা…

এই ঝিরঝির বাতাসে ওড়া ওড়না’

সুরকার যেন গীতিকারের কল্পনাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চাইত। হেমাঙ্গ বিশ্বাস থেকে কমল দাসগুপ্ত থেকে এক এক করে উঠে এসেছে প্রতিভার স্ফুরণ। রাইচাদ বড়াল, সলিল চৌধুরী, অনুপম ঘটক, সুধিন দাসগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। সলিল চৌধুরীর সৃষ্টির পেছনে অন্য এক গন সুরের অভ্যুত্থান – অরুণ বসু, মন্টু ঘোষ, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায় জাদু ছড়াচ্ছে একদল তরুণ তুর্কির ক্ষুরধার লেখায়, তার স্ত্রী জ্যোতি চৌধুরীর নিভৃত আশ্রয়। ষাটের গোড়ার দিকে ওয়েস্টার্ন সিম্ফনির আঙ্গিকে গড়ে উঠল নতুন ধাঁচের জীবনমুখী গান – অরুণ বসুর তত্বাবোধনে রুমা গাঙ্গুলির নৃত্য পরিবেশনায় ক্যালকাটা ইয়ুথ কয়ার, যা ক্রমে বিকশিত হল পরিমল সেনের দক্ষ পরিচালনায়।

মানুষের গান। জীবনের গান। প্রতি মুহূর্তের সুর মূর্ছনা এক অ-রাবিন্দ্রিক বিন্যাসে।

সমান দক্ষতায় উঠে এল মারগিয় রসবোধ। কখনও নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনও রবিশঙ্কর, কখনও আলি আকবর, আল্লা রাখা, ভি জি যোগ, বড়ে গোলাম আলি খান সাহেব থেকে বিসমিল্লা খান। কিংবদন্তি অবিস্মরণীয় সৃষ্টি মাধুর্যে ভরিয়ে দিতে লাগল অনভুতির বাসনা। বুধাদিত্য মুখোপাধ্যায়, জয়া চৌধুরী, মনিলাল নাগ – অতীত যেন বর্তমানের নতুন স্ফুলিঙ্গে পাখনা মেলে ভেসে যাচ্ছিলই ললিত গৌরী থেকে বাসন্তী কেদার থেকে ভূপনাথ হয়ে শাওনি কল্যাণে। শুভ্র বরণ এক অনন্ত সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, নীরবতার বাতাবরণ সরিয়ে, সুরের সূক্ষ্ম কারুকাজ সাজিয়ে চলেছে, একদল যুগ স্রষ্টা। প্রভাতের স্তোত্র থেকে সন্ধ্যার দেবারতি। সুরের আরাধনার সময়ও যেন সুরকেই বলছেঃ

‘তুমি আমার ভোরের বেলা

ঝিম দুপুরের দান

শেষ বিকেলে লালের ছোঁয়া

নীল তারাদের গান’

সেই হারিয়ে যাওয়া তারাদের ভিড় থেকে, অনন্ত সময়ের কিছুটা ব্যাপ্তি পেরিয়ে, সেই ‘নীল তারাদের গানকে’ তো আজও খুঁজে বেড়াচ্ছি। যাত্রাটা অনেকদিন আগেই শুরু হয়ে গেছে। পেছনের দিকে না ফিরে, মনে হচ্ছে, এক যুগ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছি। অতীতের পাল ছেঁড়া দমকা হাওয়ায়, ভেসে যাওয়া নৌকোটা, যেন অকুল সমুদ্রে ভাসছে একটা নোঙরের আশায়। ক্ষণিক আয়ুর মধ্যে প্রাণ খুঁজছে বর্তমানের কাছে। অতীতের স্মৃতিকে পেছনে সরিয়ে, বর্তমান অন্ধকারের মধ্যে হাতড়ে বেড়াচ্ছে একটা অস্পষ্ট অবয়ব। নতুন ছবি। নতুন চিত্রপটে। যা ভাসিয়ে নিয়ে যাবে জীবলোকের চাওয়াকে এক নির্দিষ্ট মোহনায়। খালি মোহনার ঠিকানাটাই এখনও জানি না। তারাদের পূর্ণতার আস্ফালনে তো শুধুই শূন্যতার রাগ শুনতে পারছি। হাজারও লোকের ভিড়ে কোথায় যেন অন্তরের নির্জনতা আমাকে গ্রাস করছে। যা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি এক বেলাভূমির তেপান্তরে, নির্জনে সহস্র কোটি গাছের বনাঞ্চলের মধ্যে।

একটু রং চাই। একটু ছন্দ চাই। একটু সুর চাই।

নাই বা হল দয়িতার হাতে হাত রেখেঃ

‘আকাশ পানে চেয়ে চেয়ে

সারা রাত জেগে জেগে’

স্বপ্ন দেখার ভিড়। তবুও সুমনের অতীতের কণ্ঠে সুর মিলিয়ে মন চায়ঃ

‘এই যে দেখেছি আবছায়াটা লাগছে ভাল

ঘরের কোনে একটি মাত্র মোমের আলো

কার তার কী?

আমরা যদি এই আকালেও স্বপ্ন দেখি’

আমিও হয়ত স্বপ্ন দেখি আগামীর। কারও হাত ধরে নয়।

নিজ বৈশিষ্ট্যে, নিজ সৌরভে, বিকশিত না-ফোটা কুড়ির স্বপ্ন।

আগামী দিনের স্বপ্ন।

যা স্পন্দন তুলবে নিঃশব্দে নীরবে মনের দেওয়ালি উৎসবে। অখ্যাত অনামি এক কবি আশিস চট্টোপাধ্যায়ের কলমে ভেসে আসে সেই জীবনবোধঃ

‘জীবনের ঝরে পড়া ধানগুলো

খুঁটে খুঁটে খেয়ে চলে স্মৃতির পাখিরা

ওগো ব্যাধ তুলো না গাণ্ডীব

তার চেয়ে হও তুমি নীল বাতিঘর

দেখাও দিশার আলো নিশার আঁধারে

অন্ধকারের দমকা আলোর রোশনাই-এর মধ্যে সেটাই তো আগামীর বীজ মন্ত্র। খরাতপ্ত আকালের মধ্যে তো বর্ষার না-চেনা মেঘমল্লারটা শোনার জন্যই উদগ্রীব হয়ে বসে আছি। হে আগামী যুগের স্রষ্টা – দেখাও সেই নবদিগন্ত, আধারের মাঝে।

আলোগুলো নিভে গেছে। ফিউজটা জ্বলে গেছে প্রচারের দাপটে। মায়াবী রাতে, তারাদের দিকে, উদাস চেয়ে বসে থাকি।

স্বপ্নের তারাদের ছোঁয়ার আশায়।

কবে আবার নতুন তারা ফুটবে?

জীবনটা আবার নিওন আলোর বাইরে, নতুন চাঁদের আলো দেখবে?

কবে আবার পরশুটা, আজ হয়ে আসবে?

Advertisements