বাংলা ভাষার বুৎপত্তি থেকে একবিংশ শতাব্দী।

কতত বছর পার হয়ে গেল।

কত লোক শহিদ হল ভাষার মর্যাদার জন্য।

কত বিবর্তন এল, লেখনী প্রকাশে।

অন্য দেশের বন্ধুরা বলে “তোমাদের ভাষাটা রসগোল্লার মতন মিষ্টি”। মিষ্টি তো বটেই। সুরেলা তার প্রকাশের ছন্দ। অনেকটা ফ্রেঞ্চ ভাষার মতন। বুঝতে না পারলেও, কোথায় যেন মন ছুঁয়ে যায়। এত সম্ভার থাকা সত্ত্বেও, বিশ্বমানের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। প্রায়শই দেখি সভা-আলোচনা-মিডিয়া-প্রেসে একটা ‘গেল গেল’ রব। ইংরেজি সাহিত্য নাকি বাংলা ভাষাকে আগ্রাসন করছে।

তাই কী?

কেউ কী কারও স্বতন্ত্রতা কেড়ে নিতে পারে? এখন তো আর এ দেশে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য নেই। আজ ৬৭ বছর পার হয়ে গেল স্বাধীনতার পর। মানভুম (পুরুলিয়া) ডিসট্রিক্টে গড়ে ওঠা ভাষা আন্দোলনের বীজ ছড়িয়ে পড়েছিল ইস্ট বেঙ্গলের ঢাকা ইউনিভার্সিটি চত্বরে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির এমনই এক দিনে। সেই ইতিহাস সকলেরই জানা।

বঙ্কিমচন্দ্র থেকে রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, জীবনানন্দ, সামসুর রহমান, হুমায়ুন আজাদ, নুরুল মোমেন, ফারুক আহমেদ, তারাশঙ্কর, রমাপদ চৌধুরী ও আরও অনেক অনেকে সাক্ষর রেখে গেছে এই বিবর্তনের পথে। যদি তাই হয়, তবে কেন একবিংশ শতাব্দীতে বসে, আবারও শুনতে হয়, এক ক্লিসে হওয়া স্লোগান? বাংলা ভাষা নাকি বিদেশি আগ্রাসনের মুখে জর্জরিত। কেনই বা কেউ তাকে আগ্রাসন করতে যাবে, ঠিক বুঝতে পারি না। কার দায় পরেছে বাংলা ভাষাকে রসাতলে ঠেলার? না কি, গ্লবালাইজেশনের পরিপ্রেক্ষিতে, আজকের লেখকরা আর সেই বিবর্তন আনতে পারছে না বলেই কী ‘গেল গেল’ রব? নিজেদের অক্ষমতাকে চাপা দিতে?

অনেকে যে চেষ্টা করেনি, তা নয়। তবে তারা তেমন কেউ ভাষার দিকপাল নয়। কেনই বা রক্ষণশীল কূপমণ্ডূক গণ্যমান্যরা তাদের গ্রহণ করবে? এটা ভাবাও বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়! তাদের আধিপত্য নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে যে।

হ্যাঁ। গ্লবালাইজেশন শব্দটা ইছে করেই ব্যাবহার করেছি। বিশ্বায়ন বলতেই পারতাম। বাংলা ভাষা প্রেমীদের কাছে সেটা অনেক সুখশ্রাব্য হত। যেমন উপন্যাস লিখতে গিয়ে যদি লিখতাম ‘উনি ইংরেজিটা বাংলায় বললেন…’। যেভাবে ইংরেজি শব্দগুলোকে বাংলায় ব্যাবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু এই ইন্টারনেটের (থুড়ি ইন্টারনেটের বাংলা প্রতিশব্দটা খুঁজে পেলাম না) যুগে কী এই ভাষাকে নিজস্ব গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কোন যুক্তি আছে? যেখানে যথাযথ ইংরেজি শব্দ নেই, সেখানে অনায়াসেই আমরা সেটাকে গ্রহণ করে নিচ্ছি।

আর যেখানে আছে!

নইব নইব চ।

বাংলা ভাষা সেখানে ‘আক্রান্ত’!

হিপক্রিসি হয়ে গেল না?

এই হিপক্রিসিটাই তো অক্ষমের অহং, ভূষণ, আভরণ, ঔদ্ধত্য ও বিপর্যয়। যাকে পাথেয় করে, বিপন্ন হয়ে ওঠে, বাংলা ভাষার দিকপালরা। যদি বাংলা সাহিত্যে হিন্দি ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে তামিল, উর্দু, ভোজপুরি থেকে ইংরেজি, ফ্রেঞ্চ, পর্তুগিজ, চাইনিজ, খামার কিংবা হাওয়াইন ভাষা ব্যবহার করলে, ক্ষতিটা কী?

বাংলা ভাষার অবমাননা হবে?

মাতৃত্বটা কী ঔরসে সীমাবদ্ধ? না, বিকাশের মহিমায়?

আজকালকার ছেলেমেয়েরা যে ভাষায় কথা বলে, সেটা কী বিশুদ্ধ বাংলা? যদি সেই ভাষাই বর্তমানের পরিপ্রেক্ষিতে সাহিত্যে প্রয়োগ করা হয়, তা হলে কী ‘গেল গেল’ রব করে আরেকটা আন্দোলন শুরু করতে হবে? না, গ্লবালাইজেশনের পথে হেঁটে ভাষাটাকে বিশ্বের দরবারে স্থায়ী করে নেওয়ার সূত্র হতে পারে?

ভাষা দিবসের প্রাক্বালে সময় হয়েছে

আরেকবার ভাবার…

নতুন করে।

আগামীর পথ ধরার…

যাতে বিশ্বায়নের চোরাবালিতে ‘উন্নত শিরে’ আগামীর বাংলা ভাষা, নিজের গুণে, মানে, উৎকর্ষে স্থায়ী যায়গা করে নিতে পারে, বিশ্বের সমৃদ্ধ মেহফিলে। যেখানে অন্য সুরের তালে ছন্দ মিলিয়ে বিশ্বায়নের নতুন সিম্ফনির ক্যাডেন্সে, নিজস্ব মহিমায় বিকশিত হতে পারে।

Advertisements